যেভাবে হতে পারে বার্সার পুনরুত্থান !

0
82

২০১৯/২০ মৌসুমের খেলা শেষ হয়েছে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার। এবছর কোন ট্রফিই জিততে পারে নি মেসির অধিনায়কত্বে থাকা দলটি। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের কাছে হারিয়েছে লীগ ট্রফি। ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ থেকে ত একরকম নাকানি চুবানি খেয়েই বিদায় নিতে হয়েছে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নদের।

নাপোলিকে হেসেখেলে হারিয়েই কোয়ার্টারে জায়গা করে নেয় স্প্যানিশ জায়ান্টরা। কাগজে কলমে কোয়ার্টারের সবচেয়ে জমজমাট ম্যাচটি নিরাশ করেছে দর্শকদের। ফেভারিট তকমা নিয়ে মাঠে নেমে সেটার প্রমাণ ভালোমতই দিয়েছে বায়ার্ন মিউনিখ। গুণে গুণে দুই হালি গোল হজম করিয়েছে বার্সাকে। একাদশে ছিলেন না গ্রিজম্যান, ডেম্বেলের মত হাই প্রাইস ফরোয়ার্ডরা। মেসি হয়ে ছিলেন নিজের ছায়া। ছন্নছাড়া ডিফেন্স আর অনভিজ্ঞ মিড আত্মসমর্পণ করেছে বারবার; বিধ্বস্ত হয়েছে, ভেঙে পরেছে তাসের ঘরের মত। সে দৃশ্য চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেন নি আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসি।

বায়ার্নের হাইপ্রেসিং এটাকিং ফুটবলের সামনে মুখ থুবড়ে পরেছে বার্সার আভিজাত্য। কোনো প্রশ্নেরই যেন জবাব ছিলো না কিকে সেতিয়েনের শিষ্যদের কাছে। প্রথমার্ধেই বলতে গেলে চার গোল খেয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে পরে কাতালান ক্লাবটি। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে সুয়ারেজ একগোল শোধ দিলেও, লোনে থাকা বার্সা তারকা কৌতিনহো যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন কি রত্নকে যত্ন না করে অবহেলায় পায়ে ঠেলেছে বার্সা ম্যানেজম্যান্ট। পনের মিনিটে লেভানডস্কির এক গোলের এসিস্ট করেই থামেন নি ব্রাজিলিয়ান তারকা, নিজে করেছেন দুই গোল। বার্সা পরেছে লজ্জায়, নিজেদের ইতিহাসের ইউসিএল নকাউটে সবচেয়ে বড় পরাজয়ের গ্লানি বাড়িয়েছে এ মৌসুমে কোনো ট্রফিই জিততে না পারার বেদনাকে।

একাদশ নির্বাচনেই সম্ভবত ভুল করেছিলেন কিকে সেতিয়েন। গ্রিজম্যান বা ডেম্বেলের কাউকে না নামিয়ে একাদশে নামান বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার আর্তুরু ভিদালকে। ম্যাচে কোনো ইম্প্যাক্ট ফেলা ত দূরে থাক, সাবেক সতীর্থদের সামনে কোনোরকম সুবিধাই করতে পারেন নি এই চিলিয়ান মিডফিল্ডার। মাঝমাঠের দায়িত্বে আরো ছিলেন ডি ইয়ং, বুস্কেটস, সার্জি রবার্তো। লা-লিগায় অসাধারন খেলা রিকি পুজ কিংবা উইঙ্গার আনসু ফাতি কেউই ছিলেন না একাদশে। ছিলেন না অভিজ্ঞ রাকিতিচও। ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছে, খেই হারিয়েছে বার্সার মধ্যমাঠের খেলা। দুই ফুলব্যাকের উপরে উঠে যাওয়ার সুযোগ ভালোমতই কাজে লাগিয়েছে বায়ার্ন মিউনিখ। দ্বিতীয়ার্ধে গ্রিজম্যান আর আনসু ফাতিকে নামালেও সুবিধা করতে পারেন নি কেউই। বেঞ্চে বসেই ম্যাচ শেষ করেছেন উসমান ডেম্বেলে, ইভান রাকিতিচ।

কোচ ভালভার্দে যাওয়ার পর কিকে সেতিয়েনকে নিয়ে আশায় বুক বাঁধেন বার্সা সমর্থকরা। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। লকডাউন শেষে শুরু হওয়া লীগে আট ম্যাচ থেকে মাত্র নয় পয়েন্ট উদ্ধার করতে পেয়েছে বার্সা। দলের এ অবস্থায় আসলে আগামী মৌসুমের জন্য কি করতে পারে বার্সা ম্যানেজম্যান্ট?

১. ভালভার্দে বা সেতিয়েন কেউই বার্সার খেলার ধরণ অনুযায়ী দলকে খেলাতে পারেন নি। যেসব খেলোয়াড় তাদের হাতে ছিলো তাদের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারেন নি দুজনের কেউই। কোচ হিসেবে এখন বার্সা নিয়োগ দিতে পারে কিছুদিন আগেই চাকরিচ্যুত হওয়া সাবেক স্পানিওল ও স্পার্স কোচ আর্জেন্টাইন মারিসিও পচেত্তিনোকে। এছাড়া অপশন হিসেবে আছে বার্সার সাবেক সহকারী কোচ ও ক্রুইফ শিষ্য বর্তমান হল্যান্ড জাতীয় দলের কোচ রোনাল্ড কোম্যান।

২. দলে যে একটা বড়সড় পরিবর্তন দরকার সেটা ৮-২ গোলের ম্যাচ থেকেই উপলব্ধি করা উচিত বার্সা ম্যানেজম্যান্টের। পিকে, বুস্কেটস, সুয়ারেজ এদের আসলে বদলের সময় এসেছে। নিজেদের সেরা সময় পার করে ফেলেছেন তাঁরা। গ্রিজম্যানকে সেন্টার ফরোয়ার্ডে খেলিয়ে নেইমারকে যদি আবার লেফট উইংয়ে ফিরিয়ে আনা যায় তাহলে সেটা হবে বার্সার জন্য সবচেয়ে ফলপ্রসু ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান। এছাড়া তরুণ আনসু ফাতি ও ডেম্বেলে থাকবেন ব্যাকাপ হিসেবে। এই গেল ফ্রন্ট লাইনের সমস্যা।

মিডে লোনে থাকা কৌতিনহোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বিধ্বংসী একটা মিডফিল্ড পেতে পারে বার্সা। কৌতিনহোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করলে কি ফলাফল পাওয়া যেতে পারে সেটা লিভারপুল আর বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ব্রাজিলিয়ান তারকার খেলাতেই ছিলো স্পষ্ট ছাপ। মিডে কৌতিনহোর সঙ্গী হবেন রিকি পুজ, ইভান রাকিতিচ, ডি ইয়ং ও নতুন দলে আসা পিয়ানিচ। এদের থেকে দুইজনকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ম্যাচ খেলালে মিড এর সমস্যা দূর হবে। এছাড়া ভার্সেটাইল খেলোয়াড় সার্জি রবার্তোও খেলতে পারেন মিডে।

ডিফেন্সে আমূল পরিবর্তন দরকার। নতুন একজন সেন্টারব্যাক যদি কেনা যায় সেটা হবে সোনায় সোহাগা। পিকেকে ব্যাকাপ ধরে ল্যাংল্যাটের সাথে জুটি বাঁধতে হবে নতুন কাউকে। এ ক্ষেত্রে একাডেমী থেকে উঠে আসা কেউ সবচেয়ে ভালো ও সুদূরপ্রসারী অপশন। অভিজ্ঞদের মধ্যে আছেন নাপোলির কুলিবালি ও পিএসজির থিয়াগো সিলভা। এদের দুইজনেরই বয়স পরতির দিকে। রাইটব্যাকে নেলসন সেমেডু, সার্জি রবার্তো রোটেট করে খেলবেন। লেফটব্যাকে জুনিয়র ফিরপোকে মূল একাদশে রেখে ব্যাকাপ হিসেবে রাখা যেতে পারে আলবাকে। এভাবে খেলালে আগামী একসিজন পরেই ফল পেতে শুরু করবে বার্সা। গোলকিপারের অতন্দ্র প্রহরী জার্মান টার স্টেগান ত আছেনই।

৩. পরিবর্তন করতে হবে অধিনায়কত্বে। মেসি চাপে পরলে ভেঙে পরেন এটা প্রায় ওপেন সিক্রেট। অধিনায়কত্বের অতিরিক্ত চাপ পিষে মারে মেসির ভেতরের মেসিকে। সেটা আর্জেন্টিনার খেলাতেই বারবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফুটবলে অধিনায়কত্বটা খুব আহামরি কোনো দায়িত্বের কাজ না। তাই সে দায়িত্ব যেতে পারে কোন মিডফিল্ডার বা টার স্টেগানের কাঁধে। মেসিকে তাঁর নিজের মত খেলতে দিলে মেসি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তাঁর প্রমাণ নিশ্চয়ই নতুন করে দেয়া লাগবে না।