২৮ বল, ৫ উইকেট, খরচ মাত্র ১ রান

0
20

পুরো ইংল্যান্ড জুড়ে তখন বাজছিল প্রিন্স চার্লস ও ডায়ানার বিয়ের সানাইয়ের সুর। দেশের আনাচে কানাচে সব জায়গাতেই আলোচনার মুলকেন্দ্র ছিল রাজকীয় এই বিয়ে নিয়ে। তবে তা নিয়ে ওই সময় খুব একটা মাথা ঘামায়নি ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল। কারণ এজবাস্টনে পরের দিনই মাঠে নামতে হবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। ওই বিয়ের থেকে এই ম্যাচের চাপ তাদের কাছে অনেক গুন বেশি।

১৯৮১ সালের অ্যাশেজের শুরুটা দাপটের সঙ্গেই করে অসিরা। প্রথম ম্যাচ জিতে এবং দ্বিতীয় ম্যাচে ড্র করে চাপে ফেলে দেয়ে ইংলিশদের। বাজে ফর্ম ও অধিনায়কত্বের কারণে নেতৃত্ব হারাতে হয় তখনকার ইংল্যান্ড অধিনায়ক স্যার ইয়ান বোথামকে। কঠিন সিদ্ধান্ত যে পরক্ষণে সুফল বয়ে নিয়ে আসবে ইংলিশদের জন্য তা হয়ত জানত না কেউই।

নেতৃত্বের বোঝা দূরে সরে যাওয়ার পর বোথাম যেন একদম অপ্রতিরোধ্য। তার অলরাউন্ড নৈপুন্যের কারণে তৃতীয় টেস্টে অসিদের ১৮ রানে হারিয়ে সিরিজে সমতা ফেরায় ইংল্যান্ড। দুই ইনিংস মিলিয়ে ব্যাট হাতে ১৯৯ রান ও বোলিংয়ে ৭ উইকেট নিয়ে ম্যাচ সেরার পুরস্কারটা ভাগিয়ে নেন তিনি।

Image result for sir ian botham 1978
(Photo: ESPNcricinfo.com)

আগের ম্যাচ জিতে ফুরফুরে মেজাজে থেকে সিরিজের এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে পরের ম্যাচে খেলতে নামে ইংল্যান্ড। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে শুরুতে আবারো সেই পুরনো চিত্রের দেখা দেয় তারা। টেরি আল্ডারমেনের তোপে প্রথম ইনিংসে অলআউট মাত্র ১৮৯ রানে। পরে ব্যাট করতে নেমে লিড নিলেও খুব বেশি এগোতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। ২৫৮ রানে অলআউট হয়ে ইংলিশদের থেকে ৬৯ রানে এগিয়ে থাকে তারা।
ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় তৃতীয় ইনিংসে ২১৯ রান করে অসিদের সামনে মাত্র ১৫১ রানের টার্গেট দাড় করায় ইংল্যান্ড। সহজ এই লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ছোট ছোট জুটি গড়ে জয়ের পথে এগোতে থাকে। অপর দিকে ইংলিশরা উইকেট পেলেও রানের গতি কিছুতেই আটকাতে পারছে না।

অসিদের স্কোর তখন ৫ উইকেটে ১০৫ রান। জয়ের একদম দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। ক্রিজে ছিলেন স্বীকৃত ব্যাটসম্যান মাইক কেন্ট ও রড মার্শ। যাদের কাছে এই রান পার করা অসম্ভব কিছু নয়। এমন সময় ইংলিশ অধিনায়ক মাইক ব্রেয়ারলি চাচ্ছিলেন যেন একটা মিরাকল ঘটুক। যাতে করে অসিদের বাকি পাঁচ উইকেট একসঙ্গে পরে যায়। আর এই জন্য তিনি বোলিংয়ে ডেকে আনেন ইয়ান বোথামকে।

কিন্তু সেই সময় বোলিং করার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না বোথাম। প্রথম স্পেলে নয় ওভার বোলিং করে কোনো উইকেট না পাওয়ার পর ভেবেছিলেন ক্যাপ্টেন হয়তো তাকে আর বল করতে ডাকবে। তাই বোলিং করার জুতা গুলো খুলে অন্য এক জুতা পড়ে নামেন ফিল্ডিং করতে। তবে অধিনায়কের নির্দেশ পাওয়ার পরপরই জুতো বদলে ফেলতে বাধ্য হন তিনি।

এরপর বোলিংয়ে এসে বোথাম যা করলেন তা এক কথায় অবিশ্বাস্য, অসাধারণ। এমন কিছু বললে কমই বলা হবে। নতুন স্পেলের প্রথম ওভারে বল করতে এসেই রড মার্শের মিডল স্ট্যাম্প উড়িয়ে দেন এই ক্রিকেটার। পরের বলেই রে ব্রাইটকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে ইংলিশদের জয়ের আশা জাগিয়ে তোলেন। ১১৪ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে তখন বিপর্যস্ত অস্ট্রেলিয়া। রান নেয়া ত দূরের কথা দলের টেলএন্ডার ব্যাটসম্যানরা বোথামের বল যেন চোখেই দেখছিলেন না।

অসিদের বাকি থাকা সেই তিন উইকেট বোথাম নিজেই নিবেন সেটা যেনপণ করে ফেলেছিলেন। ১২০ রানে ডেনিস লিলিকে ফেরানোর পর ১২১ রানে কেন্ট ও আল্ডারম্যানকে ফিরিয়ে ইংল্যান্ডকে ২৯ রানের নাটকীয় এক জয় উপহার দেন তিনি।

দলীয় অধিনায়ক ব্রেয়ারলির কল্পনার দেখা সেই মিরাকলকে বাস্তবে পরিণত করেন সর্বকালের সেরা এই অলরাউন্ডার। আর এই জন্য দরকার হয় মাত্র ২৮টি ডেলিভারীর। এবং খরচ হয় মাত্র ১ রান। এমন এক দুর্দান্ত স্পেলের পর বলার অপেক্ষা রাখে না ম্যাচ সেরার পুরস্কারটা কার হাতে উঠেছে। ঠিক তেমন বাকি ম্যাচ গুলোতে অকল্পনীয় সব পারফরমেন্স করে সিরিজ সেরার পুরস্কারটাও ভাগিয়ে নেন স্যার ইয়ান বোথাম।

বোথামের দুর্দান্ত সেই স্পেলটির কথা এখনো চলছে মানুষের মুখে মুখে। অনেক ক্রিকেট বোদ্ধার কাছে ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা বোলিং স্পেল এটি। এরকমভাবে পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই একের পর এক বিস্ময়কর কীর্তি গড়েছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এই অলরাউন্ডার। সেগুলো আলাদাভাবে বিশ্লেষণ না করে একজায়গায় লিখা কখনোই সম্ভব নয়!