সুপারম্যান সাকিবে কুপোকাত অপ্রতিরোধ্য অস্ট্রেলিয়া

0
8

” বিশ্বাস রাখি ভাই, এখনো ২২ রান লাগে (আসলে ২১) হাতে আর ১ উইকেট আছে। ১ বল লাগে, ১ বল। “

উইকেটের পিছন থেকে সাহস যুগিয়ে যাচ্ছেন অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম মিতু। বরাবরই গ্লাভস হাতে স্ট্যাম্পের পেছনে মুশফিক মানেই একটা উদ্দিপণা। লোকটা পারেও বটে!

৭১তম ওভারের প্রথম বলটা তাইজুলের বলে রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে রুখে দিলেন। পরের বলটাও একইভাবে খেললেন। কপিবুক ডিফেন্স আর কি। ওভারের তৃতীয় বলটা ব্যাটের সাথে সংযোগ রাখতে পারলেন না জশ৷ তাইজুলের ছোড়া বল টা প্যাডে লাগতেই আবেদন শুরু। তবে নাইজেল লং দু-হাত দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন বলটা কিঞ্চিৎ হাই ছিলো, স্ট্যাম্পের উপর দিয়েই চলে যাবে। চতুর্থ বলটাও ডিফেন্স করলেন জশ হ্যাজলউড। ৯ বলে শুণ্য রান। এই ওভারে টানা ৪ ডট৷ অপরপ্রান্তে ৩৩ করা অপরাজিত প্যাট্রিক কামিন্স। জয়ের জন্য দরকার মাত্র ২১। এরপরেও অজিদের আকাশে মেঘ। সময় যতো গড়ায় ততোই বাড়ছে টেনশন। কি যেনো হয়!

ওভারের ৫ম বলে প্রান্ত বদল করলেন তাইজুল। ভাগ্যের ছোঁয়া যেনো তাতেই ফিরলো। কিংবা, কপাল মন্দ দূর হলো। এবারও বলের সাথে ব্যাটের সংযোগ করাতে ব্যর্থ হলেন হ্যাজলউড। আবার তাইজুলের বলও লাফিয়ে উঠলো না। প্যাডে লাগতেই আবেদন। এবং নাইজেল লংয়ের এক আঙুলের উচ্চ ইশারা। ব্যস, মাঠে ১১ বাঘের উল্লাস শুরু। যে উউন্মাদনায় মাতছে পুরো দেশ। ভি-আইপি স্ট্যান্ডের দিকে ফিরলো ক্যামেরা, হাস্যোজ্জ্বল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷ হাতের পতাকাটা পতপত করে উড়ছে। অজিবধ ডান।

“৭১”
একাত্তর মানে বাংলাদেশ জন্য বিজয়৷ আবেগ। লোমহর্ষক এক যুদ্ধজয়ের গল্প। একাত্তরের মাঝেই যেনো আমরা বারবার নিজেদের খুঁজে পাই। সেই
৭১ এই হয়েছিলো অস্ট্রেলিয়া জব্দ। যুদ্ধের ময়দানে ৭১ এ হেরেছিলো পাকিস্তান। বাইশগজে ৭১ এ স্তব্ধ হয়েছে অস্ট্রেলিয়া। সালটা ছিলো ২০১৭। এখানেও সংখ্যাটা ওলট-পালট করলে দাঁড়ায় ৭১। ৭১ এর ঝঙ্কার, বাজছে বেশ। তো এই জয়ের কারিগর টা ছিলো কে?

ব্যাট হাতে দুই ইনিংস মিলিয়ে ১৪৯ রান। প্রথম ইনিংসে ৭১ আর পরের ইনিংসে ৭৮। তামিম ইকবাল নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টাতে একটুও পিছপা হোন নি। কিংবা উঠতি মেহেদী হাসান মিরাজের দুই ইনিংস মিলিয়ে ৫ উইকেট কিংবা তাইজুলের ঘূর্ণিতে চারে ৪। আড়াল থেকে এদের অবদানও যেনো কম না। এরপরেও তো একজন থাকেন৷ যিনি সবার ঊর্ধ্বে। একজন দলনেতা। হোক সে অধিনায়ক নয় তো? অধিনায়ক মানেই তো আর ফুটবলের মতোন আর্মব্যান্ড পড়া ঐ একজনই নন। কখনো মাঠে দলের জন্য নেতার মতোই এগিয়ে আসেন অন্য কেউ। নেতা মানেই যে শুধু অধিনায়ক তা নয়। নেতার মতোন দলের জন্য জয়ের মালা পরিয়েই তবেই বাড়ি ফেরাটাও অধিনায়কের অন্তর্ভুক্ত।

” একটি ছোট্ট ঘটনা বলি আজকে। কাল রাতে আমি আমার স্ত্রীর (শিশির) সঙ্গে কথা বলছিলাম। আমি বললাম, মনে হয় না জিততে পারবো। টাফ হয়ে গেল। আমার স্ত্রী আমাকে বলেছে, তুমিই একমাত্র আছো যে জেতাইতে পারে। ”

মিরপুরে টেস্টের চতুর্থ দিনে অজিদের জয়ের জন্য প্রয়োজন স্রেফ ১৫৬ রান। উইকেটে জমাট বেঁধেই যেনো পরে আছেন হালের অন্যতম সেরা দুই ব্যাটসম্যান স্টিভেন স্মিথ এবং ডেভিড ওয়ার্নার।

একটা সময় অস্ট্রেলিয়ার হাতে ৭ উইকেট তো জেতার জন্য প্রয়োজন ১০৭ রান। একদিকে বাংলাদেশ তো অপরদিকে অস্ট্রেলিয়া। চোখ বন্ধ করে কাউকে বাজি ধরতে বললেও সেটা ঐ অস্ট্রেলিয়ার পক্ষেই ধরবে। তবে পাশার দানও উল্টে যায়। হারের আগে হারবো না এই মানষিকতা থাকতে হয়। দেশের জন্য লড়ে যাবো বলাটা যতো সহজ করে দেখানোটা তারচেয়েও হাজারগুন কঠিন।

সেঞ্চুরি করা ডেভিড ওয়ার্নারকে দিয়েই নিজের ভেলকি দেখানো টা শুরু করলেন। দিনের প্রথম পতন টা হতে না হতেই মুশফিকের ক্যাচ বানিয়ে এবার প্যাভিলিয়নের রাস্তা ধরিয়ে দিলেন অজিদের অন্যতম ভরসা স্টিভ স্মিথকে।

তারপরেও ম্যাচের লাগাম টা অস্ট্রেলিয়ার হাতে। ৫ উইকেট হাতে, জয়ের জন্য প্রয়োজন ৭৭। ম্যাথু ওয়েডকে মাঠের বাইরে ছুড়ে ফেলে বাইশগজের ভিতরেই শুরু হলো তার নাচ। তবে জাদুর শেষ চমকটা তখনও দেখানো বাকি।

আগ্রাসী হয়ে উঠার আগে ম্যাক্সওয়েলকে ফেরালেন। হাত ঘুরিয়ে শিশুদের মতোন পাগলামি, কিংবা জয়ের আরেকটু কাছে যাওয়ার বুনো উল্লাস। দু হাত প্রসারিত করে উড়লেন। সুপারম্যান থাকে কমিকসে। রুপালি সিনেমার পর্দায়। আর বাংলাদেশের সুপারম্যান টা ঐ বাইশগজের চত্ত্বরে, দেশের জার্সি গায়ে উড়ে বেড়ায়৷

দুই ইনিংস মিলিয়ে দশ উইকেট। কিংবা ইতিহাসের চতুর্থ বোলার হিসেবে নয়টি টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে দুই ইনিংসেই পাঁচ উইকেট নেওয়ার অন্যন্য অর্জন। নিজের ৫০ তম টেস্টে সাকিবের পোয়াবোরো।

ব্যাট হাতে দুই ইনিংসে ৮৯ আর বল হাতে দুই হাতের আঙুলের সংখ্যার ১০ উইকেট। একজন সাকিব, একটা দেশ, কঠিন স্বপ্নের বাস্তবায়ন।

” দেখো, আগে আমরা শচীনের নাম শুনতাম। ইমরান খানের কথা বলত মানুষ। কিন্তু আমাদের বলার মতো ও রকম কেউ ছিল না। এখন আমরা তোমার (সাকিব) কথা বলতে পারি। ”

একটা দেশের প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে শোনা বানী। আজ থেকে দুইবছর আগের ঘটনা। স্মৃতি টা তাজা।

সাকিব ফিরছেন, কিছুদিনের অপেক্ষা। আবারও চলবে নবাবের নবাবীয়ানা। মহারাজার তোমায় সালাম। তোমার ফেরার অপেক্ষা। চলুক….