লিভারপুলের ৩০ বছরের আক্ষেপ মিটানোর গল্প

0
25

দীর্ঘ অপেক্ষার পরে প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জিতেছে লিভারপুল। ৩০ বছরের অপেক্ষার সমাপ্তি হয়েছে জুর্গেন ক্লপের হাত ধরে। ধুঁকতে থাকা এক ক্লাব থেকে ধীরেধীরে বদলে গিয়ে আজকের এই লিভারপুল হয়ে ওঠার গল্পটা শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে, এনফিল্ডে ক্লপের আগমনের মাধ্যমেই।

প্রথম মৌসুমে ইউরোপা লিগের ফাইনালে ব্যর্থ, দুই বছর বাদে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে উঠেও গোলকিপার কারিয়াসের হাস্যকর ভুলে সেই একই পরিণতি, পরের মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ জয়ের দ্বারপ্রান্তে গিয়েও ১ পয়েন্টের ব্যবধানে রানার্সআপ হয়ে লিগ শিরোপা হাতছাড়া- এসবকিছুই লিভারপুলের অপেক্ষাকে দীর্ঘায়িত করেছে, ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েছে ভক্তদের। শেষমেশ গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের মাধ্যমে হাঁফ ছেড়ে বাঁচা আর এবারের প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা উঁচিয়ে ধরে তিন দশকের অপেক্ষার অবসান।

ক্লপ এসেই যে দলটা পেয়েছিলেন সেটা দিয়ে কাজ আদতে হত না। ৫ বছর পর দুই স্কোয়াড মেলাতে গেলে দেখা যায় গুটিকয়েকজন বাদে প্রায় সবাই বদলে গেছেন। স্বাভাবিকভাবেই এমন দলের বিপক্ষে খেলা তখন কঠিন হয়ে যায়। সেটাই হয়েছে ইংল্যান্ডে। লিভারপুলের কাছে নত হত হয়েছে সবাইকে।

তবে এক ঝটকায় লিভারপুলের স্কোয়াডে গণ পরিবর্তন আনেননি ক্লপ। এসেই রেডিমেড দল পাননি, সেটা পাওয়ার কথাও ছিল না। পুরোনোদের কাউকে রেখেছেন, কাউকে বাদ দিয়েছেন। প্রতি মৌসুমে এভাবে ধীরে ধীরে দলে পরিবর্তন এনেছেন ক্লপ। ট্রেন্ট অ্যালেক্সান্ডার আর্নল্ডকে নিয়ে আসা, অ্যান্ডি রবার্টসনকে গুরুদায়িত্ব দিয়ে দেওয়া- দুটি সিদ্ধান্তেরই ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে লিভারপুলের পারফরম্যান্সে। বলে রাখা ভালো, এই মৌসুমে ট্রেন্ট অ্যালেক্সান্ডার আর্নল্ডের ১৩ এসিস্টের পাশাপাশি রবার্টসনের এসিস্ট ১১ টা, যথাক্রমে লিগের ২য় এবং ৩য় সর্বোচ্চ (শেষ ম্যাচের আগ পর্যন্ত)।

তবে দলবদলে লিভারপুল বড় কোপটা মেরেছিল ভার্জিল ভ্যান ডাইককে ভিড়িয়ে। ক্লপ আসার পর আক্রমণে লিভারপুল ধারালো হলেও, রক্ষণ সেভাবে গোছালো ছিল না কখনই। ভ্যান ডাইক এসেই গোটা চেহারা পালটে দিলেন এক নিমিষে। একটা দলে একজন খেলোয়াড় কতোখানি প্রভাব রাখতে পারেন ভ্যান ডাইক তার অন্যতম নিদর্শন। ভুলে গেলে চলবে না এর মাঝে কিন্তু ফিলিপ কৌতিনহোকেও হারিয়েছেন ক্লপ। লিভারপুলের আক্রমণভাগের প্রাণ ছিলেন যিনি। কৌতিনহোর মতো খেলোয়াড় চলে যাওয়ার পর ধ্বস নামার কথা ছিল লিভারপুলের। সেটা আবার অন্য নিদর্শন সৃষ্টি করেছে, দলের মূল খেলোয়াড় চলে গেলেও দুর্দান্তভাবে ফেরা যায়। একটা সিস্টেমের ভিত মজবুত হলেই কেবল সেটা সম্ভব। ৪-২-৩-১ এর ফর্মেশন পরিবর্তন করে ৪-৩-৩ এ খেলিয়েছেন দলকে, কৌতিনহোর অভাব মোটেও টের পাওয়া যায় নি। পরের মৌসুমে গোলকিপিংয়ের দূর্বলতা কাটাতে অ্যালিসনকে কিনে আনল লিভারপুল। লিভারপুলের শিরোপা জয়ের পেছনে ভ্যান ডাইক আর অ্যালিসনের সংযোজন নিঃসন্দেহে বড় ভূমিকা পালন করেছে। লিগ জিততে হলে শক্ত রক্ষণ লাগবেই, আর ক্লিনশিট ম্যাচের সঙ্গে শিরোপাও জিতিয়ে দেয় মৌসুম শেষে। “আক্রমণ আপনাকে ম্যাচ জেতাবে আর রক্ষণ জেতাবে শিরোপা”- বেশ পুরনো একটা প্রবাদ।

ক্লপের অধীনে গড়ে ওঠা লিভারপুলের আক্রমণের ত্রয়ীকে নিয়ে না বললেই নয়। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগের এই ত্রিফলার সবচেয়ে বড় চমক ছিলেন মোহামেদ সালাহ। লিভারপুলে এসেই বাজিমাত করেছেন, অভিষেক মৌসুমে গড়েছেন রেকর্ডের পর রেকর্ড। এই মৌসুমেও আছে ১৯ গোল আর ১০ এসিস্ট(শেষ ম্যাচের আগ পর্যন্ত)। ফিরমিনোর ধার এ মৌসুমে কিছুটা কম হলেও সেটা পুষিয়ে দিয়েছেন বাকিরা। ক্রমাগত ভয়ংকর হয়ে ওঠা দুই উইংব্যাকের সাথে আক্রমণভাগের দুই উইঙ্গার সালাহ আর মানের দারুণ বোঝাপড়া গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে লিভারপুলের শিরোপা জয়ে। দল হিসেবে ক্রমাগত ভয়ংকর হয়ে উঠছে লিভারপুল, যা তাদের কষ্টের দিনের অবসান আর ভবিষ্যৎের সুখের ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

গত ১৩ মাসে চ্যাম্পিয়নস লিগ, উয়েফা সুপার কাপ, ক্লাব বিশ্বকাপের পর ধৈর্যের চরম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিন দশক বাদে ৭ ম্যাচ হাতে রেখে রেকর্ড গড়ে প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জয়। ক্লপের ধীনে লিভারপুলের দুঃখের সূর্যাস্ত আর সুখের সূর্যোদয়। ক্লাবের হারানো ঐতিহ্য, ইতিহাস ফিরে পাওয়া হয়ত খুব কঠিন, কিন্তু অসম্ভব কিছু না। অলরেডদের জন্য এরপরে হয়ত অপেক্ষা করছে আরও অনেক কিছুই।