‘রোনালদো’ থেকে ‘রোনালদিনহো’ হয়ে ওঠার নেপথ্যে

0
21

সদা হাস্যজ্জ্বল ঐন্দ্রজালিক পাওয়া অতীব দুষ্প্রাপ্য। তাদের কীর্তিকলাপ কেমন একটা রহস্যে ঘেরা। অননুমেয়তাই যেন তাদের অনন্যসুলভ বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ফুটবলের এই উইজার্ড তার হাসির ফোয়ারাতেই করেছেন বিশ্বজয়। ফুটবলীয় কতশত দুর্বোধ্য স্কিল মুভ নৈপুণ্যতার সাথে করেছেন তার হাসির মত সাবলীল ভাবে।

সময়টা ১৯৮০ সালের ২১ শে মার্চ, ব্রাজিলের পোর্ট আলেগ্রে শহরে সেদিনও সূর্যটা উদিত হয়েছিল সহস্র বছর আগের নিয়মে। সেদিন ঐ শহরের ছোট্ট একটি ঘর আলোকিত করে আসে একটা নক্ষত্র, যার দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে কয়েক সৌরবর্ষ পরেই। বাবা হোয়াও মোরেইরা ও মা মিগেলিনা সান্তোস, ছেলের নাম রাখেন ‘রোনালদো দ্য অ্যাসিস মোরেইরা’। বাবা হোয়াও মোরেইরা একটা স্থানীয় এমেচার ক্লাবে খেললেও তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিলো অত্যন্ত নাজুক। বড় ভাই রবার্তোও প্রফেশনাল ফুটবল খেলতো গার্মিওর হয়ে, তাকে নিয়েই মূলত তার পরিবারের স্বপ্ন ছিলো। তা দেখে হয়তো ফুটবল দেবতা মুচকি হেসেছিলো, আর এমন একটা ফুটবল প্রিয় পরিবারে আলোর দিশারি করে পাঠালো ছোট্ট ‘রোনালদোকে’।

সেদিনের সেই রোনালদো থেকে রোনালদিনিহো হয়ে ওঠার নেপথ্যে অনেক বড় প্রভাবক ছিলো তার বড় ভাই রবার্তো। রবার্তোই প্রথম তার ছোট ভাইয়ের মধ্যে স্পার্ক দেখতে পান এবং সেটাকে একটা অগ্নিশিখায় রূপান্তর করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। ফুটবলটা যার সহজাত প্রভৃতি ও রক্তে মিশে আছে সে ছেলেটা সাত বছর বয়সেই অনেকটা শিখে ফেলে জোগা বোনিতো ড্রিবল, এলাস্টিকো, হোকাস পোকাসের মত কঠিন সব মুভ। ক্রমাগত কম্ফোর্ট জোনের বাইরে গিয়ে নিজেকে এক্সপ্লোর করে হয়ে ওঠেন আরো অদম্য।

মাঠের ফুটবলটা শুরু হয় ফুটসাল খেলার মাধ্যমে মাত্র সাত বছর বয়সে। অপ্রতিম বল নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা কিংবা জাদুকরী সব ড্রিবলিংয়ের হাতেখড়ি এখান থেকেই। ১৩ বছর বয়সে তিনি করে বসেন এক দুর্বোধ্য কাজ, তার দল ২৩-০ গোলে জয়লাভ করে স্থানীয় এক ম্যাচে। বিস্ময়কর শোনালেও সেই ২৩ গোল তিনি একাই জালে জড়ান। মহাকালের এই অনন্ত যাত্রায় যদি সময়কে থমকে রাখা যেত তবে অসীম কাল পর্যন্ত গ্রহবাসী তার এমন মুগ্ধতার সাক্ষী হতে পারতো। তবে থাকুক না একটুক্ষানি আক্ষেপ, স্মৃতির মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন সহস্র থেকে সহস্র বছর পর্যন্ত এটাই বা কম কিসে!

ব্রাজিলের বয়সভিত্তিক দলে অত্যন্ত সফলতার সাথে খেলার পর ৯৯ এর কোপা আমেরিকা কাপের প্রাক্কালে মাত্র ১৯ বছর বয়সেই জাতীয় দলে অভিষিক্ত হন। একই বছর কনফেড কাপেই তার দূত্যি ছড়ানোর সূত্রপাত হয়। ফাইনাল ছাড়া প্রত্যেক ম্যাচেই গোল করেন মি. নিবলার। ফলশ্রুতিতে টুর্নামেন্ট সেরার তকমাটাও নিজের করে নেন সেই সাথে সমগ্র ক্ষৌণী কে জানান দেন তার বিশ্বজয়ের পূর্বাভাস।

ব্রাজিলের ২০০২ বিশ্বকাপ জয়ী দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফ্রি কিক থেকে করা গোলটি ফুটবল বোদ্ধারা তো এত তাড়াতাড়ি ভুলতে পারেনা। এর পরের বছরই ৩০ মিলিয়ন ইউরোতে পাড়ি জমান বার্সেলোনা তে। এর পরের ইতিহাস তো সবারই জানা! বার্সা ইতিহাসের অন্যতম সেরা টাইম পিরিয়ডের সূচনাও হয় তার শিল্পস্বরূপ কৃতিত্বে। ফলস্বরূপ ২০০৪, ২০০৫ ফিফা বর্ষসেরা প্লেয়ার এর পুরষ্কার জিতে নেন। সেই সাথে ২০০৫ এর ব্যালন ডি’অর টাও নিজের করে নেন।

শতাব্দীর পর শতাব্দী কিংবা সহস্র বছর হারিয়ে যবে অনন্তকালের অতল গহ্বরে, তারপরও আপনি চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন ফুটবল ভক্তদের মনের মণিকোঠায়। বেঁচে থাকুন অজস্র বছর, হেসে যান চিরন্তন।

অতিথি লেখক: জাহিদ হাসান