রিয়াল মাদ্রিদের ফিনিক্স জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান!

Real Madrid's French coach Zinedine Zidane (R) claps for his players after winning the Spanish Super Cup final between Real Madrid and Atletico Madrid on January 12, 2020, at the King Abdullah Sports City in the Saudi Arabian port city of Jeddah. (Photo by Giuseppe CACACE / AFP) (Photo by GIUSEPPE CACACE/AFP via Getty Images)

“আমাকে দশটা কাঠের টুকরো আর একজন জিনেদিন জিদান কে এনে দেও, আমি তোমাদের চ্যাম্পিয়নস লীগের শিরোপা এনে দিব”-

বিখ্যাত উক্তিটা ফুটবলার জিদানের সম্পর্কে বলেছিলেন কিংবদন্তি স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন!

১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে দুর্দান্ত রোনালদোর ব্রাজিলকে ফাইনালে উড়িয়ে দিয়ে শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছিলো, ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে একাই দলকে টেনে তুলেছিলো ফাইনালে, বিখ্যাত “ঢুঁস” কাহিনী না হলে হয়তো সেবারো শিরোপা টা ফ্রান্সের শোকেসেই যেতো।

১৯৮৬’র ম্যারাডোনার সাথে ২০০৬ এর জিদানের কোন পার্থক্য ছিলো না, শুধু নিজের ভুলে কাপটা হাতছাড়া করেছিলেন এতটুকুই! তবে কোয়াটারে রোনালদিনহো, কাকা, রোনালদোদের অপ্রতিরোধ্য ব্রাজিলকে একাই হারিয়েছিলেন, সেমিফাইনালে উড়িয়ে দিয়েছিলেন ফিগো, ডেকো, ক্রিশ্চিয়ানোদের সোনালী প্রজন্মের পর্তুগালকে।

এরপর ফুটবল ছেড়েছেন কিন্তু আদতে ফুটবল ছাড়েননি, খেলোয়াড়ি জীবন ছেড়ে কোচিংয়ে হাত দিয়েছিলেন, আর বাজিমাৎ টা এখানেও করেছেন। ঐতিহ্যবাহী ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের যখন বাজার মন্দা, দলের বাজে অবস্থা, ফুটবলারদের ফর্মহীনতা, কোচের সাথে খেলোয়াড়দের মন কষাকষি। লা-লিগায় অন্য দলগুলোর চেয়ে ঢের পিছিয়ে ছিলো, কোচের ভুল সিদ্ধান্তে কোপা দেল রে থেকে নিষিদ্ধ গ্যালাক্টিকোরা। স্বভাবতই তাই কোচের পদ থেকে বরখাস্ত হলেন রাফায়েল বেনিতেজ, তাও আবার মৌসুমের মাঝপথেই।

চারদিকেই যখন হৈচৈ কে হতে যাচ্ছে রিয়াল মাদ্রিদের নতুন কোচ? ঠিক তখনই রিয়ালের প্রেসিডেন্ট পেরেজ ভরসা করলেন কিংবদন্তি ফুটবলার জিনেদিন ইয়াজিদ জিদানের প্রতি, যার কোচিং অভিজ্ঞতা বলতে গ্যালাক্টিকোদের বয়সভিত্তিক দল ক্যাসিলায় দেড় বছর আর এক বছর কার্লো আনচেলত্তির সহকারী হিসেবে মূল দলের পাশে থাকা। সেই জিদানের কাধেই পেরেজ তুলে দিয়েছিলেন মাদ্রিদের বড়দের দায়িত্ব টা, ঝুঁকি নিয়েছিলেন ফুটবলার হিসেবে ক্লাব কিংবা জাতীয় দল উভয়ক্ষেত্রেই কিংবদন্তি জিদানের উপরে।

কোচিং ক্যারিয়ারের প্রথম ম্যাচেই জয় পেয়েছিলেন ৫-০ গোলে, হাফ ছাড়লো মাদ্রিদিস্তারা, সামনে ভালো কিছুই আসছে হয়তো? ধীরে ধীরে দলকে গুছিয়ে আনলেন, দলের ভিতরের বোঝাপড়া টা বৃদ্ধি করলেন, খেলোয়াড়দের সাথে শিক্ষকের চেয়ে বন্ধুরুপেই বেশী সহযোগীতা করতে থাকলেন। যে রিয়াল মাদ্রিদই কয়েকমাস আগে ছন্ন ছাড়া ছিলো, সেই মাদ্রিদকেই জিতালেন চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা, আরাধ্যের লা উন ডেসিমা। সেই সাথে খেলোয়াড় হিসেবে ৯ম, সহকারী হিসেবে ১০ম আর প্রধান কোচ হিসেবে দলীয় ১১তম শিরোপা জয়ের ভাগীদার হয়ে অনন্য এক রেকর্ড গড়লেন। যে লা-লিগায় রিয়াল মাদ্রিদ ধুকতে ছিলো, সেই লিগেই ১ পয়েন্টের জন্যে ট্রফি হাতছাড়া করলেন। টেকো মাথায় ভেলকি টা এখানেই থামাননি, নূ ক্যাম্পে গিয়ে বার্সা কে হারিয়ে পূর্ন ৩ পয়েন্ট লাভ কিংবা ভিসেন্তে ক্যালদারনতে গিয়ে মাদ্রিদের আরেক ক্লাব অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদকে নাকানিচোবানি খাওয়ানো, জিদান জয় করেছে ইতালিও।

Image result for zinedine ucl winner

১৯৮৮-৮৯ মৌসুমে লিও বেনহ্যাকারের রিয়াল মাদ্রিদ টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত থাকার ক্লাব রেকর্ড গড়েছিলেন, জিনেদিন জিদানের অধীনে থাকা এ দল টা নিজেদের এ রেকর্ড টপকিয়ে বার্সার গড়া স্প্যানিশ রেকর্ড টাও ভেঙ্গে দিয়েছিলো। কোচিং ক্যারিয়ারের প্রথম বছরেই জিতেছিলেন ৩ টি গুরুত্বপূর্ণ শিরোপা, প্রথম ১৭ মাসে মূল্যবান ৫ টি শিরোপা। লা-লিগা উদ্ধার করেছিলেন, প্রথম দল হিসেবে রিয়ালকে টানা ২ টি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতিয়েছেন, নিজেও কোচ হিসেবে সবচেয়ে কম সময়ে ২টি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছেন, ইতিহাসের সপ্তম জাদুকর হিসেবে কোচ ও ফুটবলার উভয় ভুমিকাতেই ইউসিএল জেতা এই লোকটার অধীনে টানা সবচেয়ে বেশী ম্যাচে গোল করেছে রিয়াল মাদ্রিদ। তবে জয়রথ টা সেখানেই থামাননি, প্রথম ফুটবল দল হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদ চ্যাম্পিয়নস লিগে টানা ৩ বার শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছে এই টেকো মাথার লোকটার অধীনেই ভালো খেলোয়াড় নাকি ভালো কোচ হতে পারেন না, বহুল প্রচলিত এ প্রবাদ টাকেই তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন একজন জিদান।

হোয়াইট হান্টারদের চ্যাম্পিয়নস লিগে ১৩তম শিরোপা উপহার দিয়েছেন, মাত্র আড়াই বছরে ৯টা শিরোপা জিতেছেন, ঈর্ষনীয় সাফল্যতে টানা ৩ বার চ্যাম্পিয়নস লিগ, টানা ২ বার উয়েফা সুপার কাপ, টানা ২ বার ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ, কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করার পর থেকে এখন পর্যন্ত একটা সিজনও শিরোপা ছাড়া শেষ করেননি।

২০১৮ সালের মে মাসের ৩১ তারিখ দিনটা অন্যসব দিনের মতোই হতেই পারতো, যদি না সেদিন সারা বিশ্বকে চমকে কোচিং থেকে অব্যহতি না নিতেন এই কিংবদন্তি। এর ক’মাস পরে রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে জুভেন্টাসে পাড়ি জমান জিদানের প্রিয় শিষ্য ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও। স্বাভাবিক ভাবেই দুই বড় হাতিয়ার ছাড়া অচল হয়ে পড়ে রিয়াল মাদ্রিদও!

চ্যাম্পিয়নস লিগ, লা-লিগা, কোপা দেল রে জিততে পারেনি কোন শিরোপাই৷ ট্রফিলেস সিজনের চেয়ে ছন্নছাড়া এক রিয়াল মাদ্রিদকেই মাঠে বিরক্ত লাগে বেশী৷ নিজেদের ইতিহাসের অন্যতম বাজে মৌসুমও কাটায় হোয়াইট হান্টাররা। মাঝে দুইবার দুই কোচের বদলেও ভাগ্য ফেরাতে পারেনি রিয়াল মাদ্রিদ। জিনেদিন জিদান আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো মাদ্রিদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো হাড়ে হাড়ে টের পায় ফুটবল বিশ্ব!

তবে সব অভিমান ভুলে আবারো মাদ্রিদের ডাগ-আউটে ফিরেছিলেন জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান। হ্যাজার্ড, লুকা জোভিচ, ফারল্যান্ড মেন্ডিদের মতো তারকাদেরও দলে ভিড়িয়েছেন। ক্রিশ্চিয়ানোকে সাথে নিয়ে জিতেছিলেন আড়াই বছরে ৯ টা শিরোপা, এবার রোনালদো ছাড়া কতটা সফল হতে পারেন এই কিংবদন্তি তা দেখার অপেক্ষায় ছিলো ফুটবল বিশ্ব!

Image result for zinedine zidane

নতুন সিজনের শুরুতেই মাদ্রিদের গোলবার ছেড়ে কেইলর নাভাস চলে গিয়েছিলো প্যারিসে৷ তার জায়গাটা আপাতত পাকাপোক্ত করে নিয়েছেন থিবোয়া কর্তোয়া৷ অথচ সিজনের শুরুর দিকে বড্ড বাজে ফর্মহীনতায় ভুগছিলেন এই বেলজিয়ান গোলরক্ষক, ছন্নছাড়া ছিলো গত দশকের সেরা ক্লাব নির্বাচিত হওয়া রিয়াল মাদ্রিদও। স্বভাবতই, নিন্দুকেরা পিছে লেগেছিলো জিদানের৷

ফুটবলের মহল থেকে চায়ের দোকান, সবজায়গাতেই চলছিলো, এবার তবে বিদায় হবে জিদানের। রোনালদো ছাড়া আর কি এই লোক সফল হবে? ট্যাকটিসবিহীন কোচ হিসেবেও সমালোচনার মুখে পড়েছেন বারবার।

অথচ যার রক্তেই আছে বীরের মতো লড়ে যাবার শক্তি, জন্মই যার বিজয়ী হওয়ার সে কি এতো সহজে হাল ছেড়ে দেয়? সম্প্রতি, সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত স্প্যানিশ সুপার কাপ জিতে আরো একবার নিজের জাত চেনালেন টেকো মাথার এই জিনিয়াস। বেনজেমা, বেল, হ্যাজার্ড সহ দলের অনেক নিয়মিত ফুটবলাররাই ইঞ্জুরির জন্য এই টুর্নামেন্টে ছিলো না। অথচ ঠিকই এরপরেও রিয়ালের শোকেসেই উঠেছে শিরোপা!

সেমিফাইনালে সবাই যখন চিন্তিত কি হতে পারে একাদশ, ঠিক তখনই সবাইকে হতবাক করে অবিশ্বাস্য এক ট্যাকটিস নিয়ে দল সাজালেন এই ভদ্রলোক। পাঁচ মিডফিল্ডার নিয়ে অদ্ভুতুড়ে এক ট্যাকটিস নিয়ে মাঠে নামলো দল, তাতে ফলও মিললো রিয়ালের অনুকূলে, ৩-১ এর জয় নিয়েই শক্ত প্রতিপক্ষ ভ্যালেন্সিয়াকে হারিয়ে ফাইনালে উঠলো রিয়াল মাদ্রিদ৷

আর ফাইনালে মাদ্রিদের প্রতিপক্ষ ছিলো নগর প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। যারা সেমিফাইনালে মেসির বার্সাকে উড়িয়ে দিয়েই উঠেছিলো ফাইনালে। স্বভাবতই, সবাই যখন ভাবছে এবার কি হবে রিয়াল মাদ্রিদের? তখন সেই একই প্রদ্ধতি ব্যবহার করলেন জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান। আবারও সেই ৫ মিডফিল্ডার দিয়ে দল সাজালেন। ফলাফল, নতুন দশকের প্রথম শিরোপা রিয়াল মাদ্রিদের শোকেসে।

এই নিয়ে মাদ্রিদের ডাগ-আউটে দাঁড়িয়ে ৯ টা ফাইনালের ৯ টাতেই শিরোপা জিতলেন। আর রিয়ালের হয়ে সব মিলিয়ে ১০ টা শিরোপা জেতা হয়ে গেলো এই ফুটবল কিংবদন্তির৷ লা-লিগাতেও আপাতত বার্সেলোনার সাথে যৌথভাবে রিয়াল মাদ্রিদ টেবিলে সবার উপরে।

চীনের রুপকথায় ফিনিক্স ছিলো। রিয়াল মাদ্রিদের জন্য সেই ফিনিক্স হচ্ছেন একজন জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান। মৃতপ্রায় দলটাকে আবারো বাচিঁয়ে তুলছেন, ফিনিক্সের মতোনই নতুন জীবনে পদার্পণ করছে রিয়াল মাদ্রিদ।

নতুন দশকে জিদান কতটুকু সফল হবে তা হয়তো সময়ই বলে দিবে। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই এই ভদ্রলোকের বাজে সময় তাকে বেঁচে দিতে চাওয়া মানুষেরা আপাতত চুপ। কিন্তু জিদানের ট্যাকটিস নাই বলা নিন্দুকদের সেই বহুল প্রচলিত বচন ” রোনালদো, কপাল ” এবার বন্ধ হবে তো?