রিমনের প্রয়াত বাবার স্বপ্নেই; আজ স্বপ্ন দেখছে গোটা দেশ

0
125

নওগাঁ জেলার শৈলগাছী গ্রামের প্রয়াত মাহবুবুর রহমানের ছেলে রিমন হোসেইন। বয়সটা সবে ২০ পার হচ্ছে। আর ইতিমধ্যেই নিজের নজর কারা ফুবলীয় শৈলিতে বাংলাদেশের ফুটবল প্রেমিদের গোল টেবিলের বৈঠকের বড় একটা অংশ জুড়ে বসেছে সে।

ছেলে বেলা থেকেই ফুটবলার হওয়ার প্রবল ইচ্ছা শক্তি ছিলো তার। প্রয়াত বাবারও স্বপ্ন ছিলো তার ছেলে একদিন লাল-সবুজে জার্সি গায়ে চাপিয়ে প্রতিনিধিত্ব করবে নিজ দেশের। নিজে কৃষিকাজ করত। ছেলে রিমনও তাকে করত সহায়তা। তারপরও নিজের ছেলেকে নিয়ে তার দু-চোখ ভরা স্বপ্ন আজকের রিমনকে আবিষ্কার করে দিলো আমাদের মাঝে।

নিজের ছেলে জাতীয় দলে খেলবে, সেই স্বপ্ন ঠিকই পূরণ করেতে যাচ্ছে তার ছেলে কিন্তু নিজে দেখে যাওয়ার মত সৌভাগ্য হলো না তার। নিথর দেহ ধরনীর বুকে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে মাহবুবুর রহমানের। হয়ত স্বর্গ থেকে দু-হাত ভরে আশির্বাদ করছেন ছেলের জন্য। গর্ববোধ করছেন নিজের ছেলের কির্তীতে।

২০১৫ সালে নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য যশোরের শামসুল হুদা ফুটবল একাডেমিতে যোগ দেয় রিমন। সেখান থেকে এত বড় স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয়। মূলত এই একাডেমি থেকেই রিমনের উঠে আসা। তারপর ২০১৬ সালে বসুন্ধরা কিংসের হয়ে পাওয়ানিয়র লিগে মাঠে নামে সে। আর এই টুর্নামেন্টে তার গোল সংখ্যা ছিলো ১৩ টি।

ঢাকার ফুটবলে রিমনের পাদচারণার শুরু হয় পাওয়ানিয়র লিগ দিয়েই। তারপর ২০১৮ সালে রিমন থার্ড ডিভিশনে আরামবাগ ফুটবল একাডেমির হয়ে ৮ গোল করে টপ স্কোরার হয়। এরপর অ-১৮ বি লিগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোল দাতা হয়ে নিজ দল ঢাকা আবাহনীকে চ্যাম্পিয়ন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সে।

একটু একটু করে নিজের প্রতিভার ঝলকানি ঢাকার ফুটবলে দেখাতে শুরু করা রিমন ২০১৯ সালে সুযোগ পায় দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে সেকেন্ড ডিভিশনে খেলার। সেখানে খেলে ৫ গোল করেন।

দ্বিতীয় ডিভিশনে মোটামুটি ভালো পারফর্ম করার পর রিমন বাংলাদেশ এফএফ ফার্স্ট ডিভিশনে ফ্রেন্ড’স সোশ্যাল ক্লাবের হয়ে ৮ গোল করে টপ স্কোরার হয়ে নজরে আসে বসুন্ধরা কিংসের। তারপরের গল্পটা তার জীবন বদলে দেওয়ার।

বসুন্ধরা কিংসে যোগ দেওয়ার প্রথম সিজন সবে। রিমনের গোল স্কোরিংয়ের দক্ষতা দেখে টিম ম্যানেজমেন্ট তাকে দলে নিলেও তখন কিংস একজন লেফট ব্যাকের খোঁজে ছিলো। আর দলে রিমনের আগমনের পর অস্কার মনস্থির করে তাকে লেফট ব্যাক পজিসনে ট্রাই করাবে।

অস্কারসহ বাকি কোচিং স্টাফরা রিমনকে জিজ্ঞাসা করে সে লেফট ব্যাক পজিসনে খেলতে পারবে কিনা? ব্যস! রিমনও হ্যাঁ বলে দেয়। ফেডারেশন কাপে রহমতগঞ্জের বিপক্ষে ম্যাচের আগে যখন রিমনকে লেফট ব্যাক হিসেবে খেলাবে অস্কার তখন থেকেই শুরু হয় সমালোচনা। এরপর…

রহমতগঞ্জের বিপক্ষে ম্যাচেই অভিষেক, ইম্প্রেসিভ পারফর্ম করে সমালোচকদের বুড়ো আঙুল দেখানোর যাত্রা শুরু। তারপর একে একে ফেডারেশন কাপের সবগুলো ম্যাচ খেলে বসুন্ধরা কিংসের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতে সকলের বুঝতে বাকি থাকে না রিমন লেফট ব্যাক পজিসনে থিতু হয়ে যাবে।

বিপিএলের প্রথম পর্বের শুরু থেকেই রিমনের বাজিমাত চলতে থাকে। বসুন্ধরা কিংসের জয় রথের প্রতিটা ক্ষণের সারথি রিমন। প্রথম পর্বে কিংসের ১২ ম্যাচে ১১ জয় এবং ১ ড্র। ক্লিনশীট এসেছে সাতটিতে। আর কিংসের এমন সাফল্যে রিমনের অবদান ছিলো গুরুত্বপূর্ণ।

বসুন্ধরা কিংস এখন পর্যন্ত এই সিজনে ১৭ টি ম্যাচ খেলেছে আর রিমনও খেলেছে ১৭ টি ম্যাচেই। সে অস্কারের এতটাই প্রিয় হয়ে উঠেছে যে এক মিনিটের জন্যও তাকে বেঞ্চে থাকতে হয়নি। ফেডারেশন কাপে একটা হলুদ কার্ড পেলেও লিগে এখনও কোনো কার্ড দেখতে হয়নি রিমনকে। কতটা সলিড ডিফেন্ডিং এবিলিটি তার মধ্যে রয়েছে এই স্ট্যাট থেকেও ধারনা নেওয়া যায়।

রিমনের ধারাবাহিক পারফর্মের উপর ভিত্তি করে দেশের ফুটবল প্রেমিরা আশা করেছিলো সে খুব শীঘ্রই জাতীয় দলে ডাক পাবে। আর সেই আশাও সত্যি হয়ে গেল খুব দ্রুতই। নেপালের আসন্ন ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টর জন্য প্রাথমিক দল ঘোষনা করেছে জেমি ডে, সেখানে রয়েছে রিমনের নামও।

জাতীয় দলের জার্সিতে সর্বদা খেলতে চাওয়া রিমন এত তাড়াতাড়িই লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে ভাবতেই পারেনি। লেফট ব্যাকে শিফট করে রিমনের কোনো অসুবিধা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে সে জানিয়েছে লেফট ব্যাক পজিসনে খেলতে তার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। সে এই পজিসনে সর্বদা খেলবে ভাবেনি এর আগে। তবে এখন তার ইচ্ছা এই পজিসনেই কন্টিনিউ করা।

রিমনের এই স্বর্ণালি শুরুর পথটা কতটা মলিন হয় সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা। দেশ-বাসির প্রতাশ্যা কতটুকু পূরণ করবে সে ভবিষ্যতেই দেখা যাক। ধন্যবাদ রিমনের প্রয়াত বাবাকে, যার স্বপ্নেই আজ স্বপ্ন দেখছে গোটা দেশ। যার স্বপ্নই আজ এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এনে দিলো দেশকে। টাকা-পয়সার দোহাই দিয়ে যে বাবারা নিজের ছেলেদের স্বপ্নগুলোকে গলাটিপে হত্যা করে তাদের কানে পৌঁছে যাক রিমনের উঠে আসার গল্প। তাদের নিকট রিমনের প্রয়াত বাবা হয়ে উঠুক অনুপ্রেরণা। সেই অনুপ্রেরণায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে আসুক গ্রাম বাংলার হাজারো রিমনরা।