রিও অলিম্পিক : ব্রাজিল ফুটবলের প্রথম স্বর্ণজয়ের উচ্ছাস

(After the weverton’r safe, he gifted to Neymar the opportunity to concluded here…..
Neymaaaar, of Barcelona, of Brazil…..) টিভি কমেন্ট্রি তে যখন লাইনগুলো ভেসে আসছিলো, তখন পুরো মারাকানা জুড়ে পিনপতন নিরবতা, কপালে চিন্তার ভাজ, নেইমার কি পারবে শটটি গোলে পরিণত কররে, নেইমার কি পারবে পুরা ব্রাজিলে খুশির জোয়ার বয়ে দিতে, নেইমার কি পারবে অপুর্ণতা ঘোঁচাতে!! শুধু মারাকানা কেনো?? পুরো ব্রাজিলের আজন্ম আফসোস, সারা বিশ্বের কোটি ব্রাজিল ফ্যানের তীক্ষ্ণ নজর; এবার কি ঘুঁচবে অপেক্ষার পালা??

নেইমার আসলেন!! বল বসালেন, একটু পিছনে সরে আসলেন, এগিয়ে গেলেন শ্যুট নেওয়ার জন্যে!! তারপর??

(Giiiiveeees Brazil their 1st ever olympic gold medal…..
Such delight, joy.. And pain of the 7-1 lost to germany in the world cup forgotten…..)

টিভি কমেন্ট্রিতে যতক্ষণে এই লাইনগুলো ভেসে আসছিলো, ততক্ষণে নিরবতা ভেংগে মারাকানা জুড়ে নেমে আসল উচ্ছাসের চিৎকার, অঝোর নয়নে কাঁদছেন নেইমার তথা পুরো ব্রাজিল স্কোয়াড! এ তো অধরা কে হাতে পাওয়ার উদযাপন এ মহারণ, নেইমার যে বছরের পর বছরের অপুর্ণতা ঘোচালেন!!

অথচ শুরুটা কি ভয়াবহ ছিলো নেইমারের জন্যে! পুরা ব্রাজিল দলের জন্যে!

ঘরের মাঠের অলিম্পিক, প্রস্তুতি চলছিলো বহুদিনের, এবার অন্তত আক্ষেপ মেটানোর পালা! পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলো যে মানুষটা সেই মানুষটাই অদ্ভুত এক সমীকরণে পড়ে যায়! ব্রাজিলের সামনে দুইটা মেজর টুনার্মেন্ট, শতবর্ষী কোপা আমেরিকা আর অধরা স্বর্ণপদকের অলিম্পিক। ক্লাব বার্সেলোনা’র নিয়মের বেড়াজালে নেইমারকে ওইসময় যেকোন একটি টুনার্মেন্টকে বেছে নিতে হয়, হয় তিনি কোপা আমেরিকা খেলবেন নতুবা অলিম্পিক; দুইটি টুনার্মেন্টই খেলার ছাড়পত্র দিতে অস্বীকৃতি জানায় বার্সা ম্যানেজমেন্ট। নেইমার তখন বেছে নেন, অলিম্পিক কে। ব্রাজিল, যে নামের মাঝেই লুকায়িত ফুটবলের যত সফলতার সকল বিশেষণ; অথচ সেই দলটারই কিনা নেই অলিম্পিক স্বর্ণপদক! ২০১৬ – রিও অলিম্পিকে ব্রাজিলবাসীর সেই অধরা স্বপ্নপুরণের দায়িত্ব নিজ ঘাড়ে তুলে নেন নেইমার! অধরা স্বপ্ন পুরণের দায়িত্ব, পুরা ব্রাজিলবাসীর মনের কাঙ্ক্ষিত লালিত স্বপ্ন পুরণের দায়িত্ব, নিজ দেশকে একটি স্বর্ণপদক পাইয়ে দেওয়ার দায়িত্ব।

গোলবারের নিচে ওয়েভারটন; ডিফেন্সে রদ্রিগো কায়ো, মার্কুইনহোস, জিকা, ডগলাস সান্তোস; মিডফিল্ডে লুয়ান, ওয়ালেস, রেনাটো অগাস্তো; ফ্রন্টে নেইমার, জেসুস, বারবোসা!

কাগজে কলমে এমন শক্তিশালী দল নিয়েও সাউথ আফ্রিকা আর ইরাকের সাথে ড্র! আর পুরো ব্রাজিল জুড়ে সমালোচনা আর সমালোচনা! পত্রিকা, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, ব্রাজিলের সাবেক খেলোয়াড়, সকলের তুমুল সমালোচনার মুখে ব্রাজিল দল, আর সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে একজন নেইমার! স্টেডিয়ামের কোন এক কোনায় এক দর্শক নিজের হলুদ জার্সিতে নেইমারের নাম কেটে দিয়ে লিখে দিয়েছিলেন ফুটবল কুইন মার্তার নাম, ব্রাজিলের সকল পত্র-পত্রিকায় চলছে নেইমার তথা পুরা ব্রাজিল দলের সমালোচনা, টেলিভিশন-রেডিওগুলোতে সমালোচনায় পৃষ্ট করে দেয়া হচ্ছে নেইমার কে, ব্রাজিলের সাবেক লিজেন্ডরা প্রশ্ন তুলছিলেন নেইমারের দায়িত্ববোধ নিয়ে, নেইমারের সক্ষমতা নিয়ে, টুইটার টুইটম্বুর #Neymar_out হ্যাশট্যাগে; ব্রাজিল যে পরপর দুই ম্যাচে গোলশূন্য ড্র করে খাদের কিনারায়!! নেইমার ছিলেন নিষ্প্রভ, ছিলেন নিশ্চুপ’ও।

পুরো ব্রাজিল দলে হতাশার ছায়া, রাজ্যের চাপ; এইবুঝি আবারো হাতছাড়া হয়ে যায় কাঙ্ক্ষিত স্বর্ণ!

নেইমার তার এই কঠিন দিনের কথা স্মরণ করে, একজনের কথা বলেছিলেন, যিনি পাশে দাড়িয়েছিলেন নেইমারের! ২০১২ তে লন্ডন অলিম্পিকে জুডোতে ব্রাজিলকে রিপ্রেজেন্ট করা ফেভারিট রাফায়েলা সিলভা প্রিলিমিনারি রাউন্ডেই ডিসকোয়ালিফাই হওয়ায় যখন সে প্রচুর ক্রিটিসাইজড হতে থাকে তখন শত শত দুয়ো ধ্বনির মাঝে তার দেশের ফুটবল টিমের এক প্লেয়ার সান্তনা কিংবা সম্ভাবনার বানি শুনিয়েছিলেন তাকে “Train to realize your dream in Rio 2016..”, ঠিক চারবছর পর রিও ২০১৬ তে সেই ডিসকোয়ালিফাইড রাফায়েলা সিলভাই ব্রাজিলকে এনে দিয়েছিলেন আসরের প্রথম সোনার সাদ!! যিনি নেইমার কে থ্যাংকস আর শুভকামনা জানিয়ে পোস্ট দিয়েছিলেন, যা কিনা অনুপ্রাণিত করে নেইমার কে!

নেইমার নামলেন, লড়লেন, জিতলেন।

ডেনমার্ক কে বারবোসার ২ গোল, ১ গোল, লুয়ানের ১ গোলে ৪-০ গোলে, কোয়ার্টার ফাইনালে নেইমার আর লুয়ানের গোলে কলম্বিয়াকে ২-০ গোলে, হন্ডুরাস কে নেইমারের রেকর্ড ১৭ সেকেন্ডের গোল সহ ২ গোল, জেসুস লুয়ান মার্কুইনহোসের গোলে ৬-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ব্রাজিল। প্রতিপক্ষ জার্মানি।

জার্মানি, ৭-১ ট্রাজেডির পর, এক জুজু’র নাম। সেই ভয়, পুরা ব্রাজিলবাসীর প্রত্যাশার চাপ, মিডিয়ার চাপ, নেইমারের শত সমালোচনার জবাব দেয়ার চাপ, নিজেকে আরো একবার প্রমাণ করার চাপ। খেলা চলছে। ২৭ মিনিটে নেইমারের অসাধারণ এক ফ্রি কিকে লিড পেলো ব্রাজিল। ৫৯ মিনিটে মেয়েরে’র গোলে সমতা আনল জার্মানি। বাকী গল্প কেবলই পাল্টাপাল্টি আক্রমণ এর। দুই দলেরই মুহুর্মুহু আক্রমনের মাঝ দিয়ে শেষ হয় ১২০ মিনিটের খেলা। ট্রাইব্রেকারে গড়ালো ম্যাচ। দুদলেরই পরপর ৪ টি শ্যুট গোলে পরিণত হয়। ৫ নম্বরটি নিতে আসেন জার্মানির পিটারসেন, ব্রাজিলের গোলরক্ষক উইভারটন অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দিলেন শট’টি। আর মঞ্চ প্রস্তুত হয়ে যায় ব্রাজিলের প্রথম স্বর্নজয়ের, নেইমারের সকল সমালোচনার জবাব দেওয়ার!

নেইমার জিতলেন, সমালোচনা কে বুড়ো আংগুল দেখিয়ে দিলেন, একই সাথে ব্রাজিলবাসীর সেই অধরা স্বপ্নপুরণ করলেন, ব্রাজিলের প্রাপ্তির খাতায় যোগ করলেন প্রথম অলিম্পিক স্বর্ণ!

টিভি কমেন্ট্রিতে ভেসে আসছিলো – There is relief, joy and celebration….. And it’s carnival in the Maracana!!!!