রমন লাম্বা – ঢাকার মাঠে ক্রিকেটারের ট্রেজিক মৃত্যু

0
12

রমন লাম্বা। ঢাকার মাঠে পরিচিত নাম। ফিল্ডিংয়ের সময় মাথায় বল লেগে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, অতঃপর অকাল মৃত্যু। ভারতের জাতীয় দলের নিয়মিত মুখ রমন লাম্বা এর অকাল মৃত্যু ঘটে ১৯৯৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি।

১৯৯৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। লিগের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মোহামেডানের মুখোমুখি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনী। ১৫৮ রানে পুঁজি নিয়ে জিততে হলে করতে হতো ব্যাতিক্রম কিছু। তাই করেছিলেন আকাশী নীলদের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলট। তবে তার মূল্য এভাবে দিতে হবে কে জানতো।

খেলার শেষদিকে ব্যাটসম্যানের খুব কাছে শর্ট লেগে ফিল্ডিং করতে আসলেন রমন লাম্বা। তার কয়েক মুহূর্ত পরেই গুরুতর আঘাত পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে। ৩৮ বছরের রমন লাম্বা মাঠে জ্ঞান হারাননি। কিন্তু ড্রেসিংরুমে যাওয়ার পর তাঁর সহ্যক্ষমতার সীমা পেরিয়ে যায়। বমি করতে করতে অজ্ঞান হয়ে যান রমন লাম্বা। সেই যে সংজ্ঞা হারালেন আর ফিরলেন না। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তিনদিন থমকে ছিলেন রমন লাম্বা। দেশ সেরা সব চিকিৎসকদের চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে, ২৩ ফেব্রুয়ারি।

আবাহনী ক্রিকেট দলের তৎকালীন ক্রিকেটার শেখ মামুন তখন খুব কাছ থেকেই দেখছিলেন মর্মান্তিক এই দূর্ঘটনা।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, খেলার মাত্র কয়েকটি বল বাকি থাকায় বিপদজনক ঐ স্থানে হেলমেট পড়তে চাননি রমন লাম্বা। তিনি বলছিলেন, “আমরা তাকে বলেছিলাম হেলমেট নিতে। কিন্তু সে বলল ‘আরে ইয়ার অনলি ওয়ান বল’।”

একইসঙ্গে তিনি ওই সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “শর্ট বলে মেহরাব হোসেন অপি পুল করলে বলটি রমন লাম্বার মাথায় লাগে আর ১০ গজ দূরে পাইলট সেই বলটি ক্যাচ ধরেন। মেহরাব হোসেন অপি আউট, ম্যাচ আমি জিতেছি, কিন্তু রমন লাম্বাকে আর পাইনি। তিনদিন অজ্ঞান থাকার পর সে হাসপাতালে মারা যায়।”

শেখ মামুন এও বলছিলেন, রমন লাম্বার মৃত্যুটি তাদের দলের জন্য সতর্কবার্তাও দিয়ে গিয়েছিল। ক্রিকেট মাঠে দুর্ঘটনায় মৃত ক্রিকেটারের জন্মদিনে একটু মনে করা।

ভারতের হয়ে আশির দশকে অভিষেক হয় রমন লাম্বার৷ ৪ টেস্ট আর ৩২ ওয়ানডেতে থেমে গিয়েছিল তাঁর আন্তর্জাতিক কেরিয়ার৷ কিন্তু রমন লাম্বার ক্রিকেটপ্রেম তাতে আটকে থাকলে তো! বাংলাদেশ, আয়ারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডে চুটিয়ে ঘরোয়া লিগ খেলেছেন। খেলতে খেলতেই প্রেম হয়ে যায় আইরিশ তরুণী কিমের সঙ্গে। এই যে রমন লাম্বা মাঠে নেমে হেলমেট পড়তে চাইতেন না সেটা ওই কিমের জন্যই৷

ভারতের হয়ে খেলার সময়ও হেলমেট পড়তেন না রমন লাম্বা। তাহলে তো কিম দেখতে পাবে না! যে অভ্যাসটা তাঁর রয়েই গিয়েছিল। শুধু ক্রিকেট নয় প্রেমেরও সংজ্ঞা নতুন করে লিখে গিয়েছেন রমন লাম্বা। কিমকে নিয়ে দিল্লিতে সুখের ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।

স্বামীর আঘাতের খবরে বাংলাদেশে ছুটে এসেছিলেন রমনের স্ত্রী কিম লাম্বা। উদাসী চাহুনী আর ভেজা চোখে দায় চাঁপিয়েছিলেন আবাহনী কর্তাদের। আর লম্বার এমন চলে যাওয়ার স্মৃতিটা এখনও তাড়িয়ে বেড়ায় মেহরাব হোসেন অপিকে। ফেব্রুয়ারির এই নির্দিষ্ট তারিখের প্রতিটা রাত নির্ঘুম কাটে তার।
রমন লম্বার মৃত্যুর পর বিসিবি কথা দিয়েছিলো ধরে রাখতে উদ্যোগ নেয়া হবে তার স্মৃতি। কিন্তু রাজনীতির ম্যারপাচে কথা না রাখার দায়ভার কারো ওপরই চাঁপেনি।
১৯৯১ সাল থেকে ভারতের এই ক্রিকেটার বাংলাদেশের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন। আর প্রতি মৌসুমে নিয়ম করে আবাহনীতে খেলতে আসতেন। এভাবে লাম্বা হয়ে উঠেছিলেন আবাহনীর ‘ঘরের ছেলে’।