মাশরাফি মানে একটা মহাকাব্য, একটা চেতনা!

আমাদের দেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে বড় আফসোসের মধ্যে অন্যতম পেসারদের গতি নেই৷ অথচ ১৮ বছর আগে ১৮ বছরের এক টগবগে যুবকের বোলিংয়ে বাইশ গজ কেঁপে উঠেছিলো, গতি ছিলো ১৪৮+ কিঃমিঃ!

গোড়া থেকে শুরু করা যাক,

ধানমন্ডি স্টেডিয়ামে খুলনা বনাম ঢাকা মেট্রোপলিটন এর ম্যাচ চলছে, বয়স বেশী বলে খেলতে পারলেন না নড়াইলের এক তরুণ। কিন্তু জাহিদ রেজা বাবু ঠিকই হিরকখন্ড চিনেছিলেন। মেডিকেল পরীক্ষায় করিয়ে বয়সের বাধা উতরে দিলেন, পরদিন সেই তরুণেরই আগুনঝড়া গতিতে জয় পেলো খুলনা। এর কয়েক বছর পরের কথা, ২০০১ সালে ডাক পেলেন জিম্বাবুয়ে সিরিজে, অভিষেকেই গ্রান্ট ফ্লাওয়ারের স্ট্যাম্প শূন্যে উড়ালেন, প্রথম ইনিংসেই চারখানা উইকেট। যদিও পথচলা টা সুখের হয়নাই, দু’মাস পরেই ইনজুরিতে, যা আর কখনো নড়াইলের সেই তরুণকে ছেড়ে যায়নি। উনার ইঞ্জুরির শুরুটা হয়েছিলো আমাদেরই অবহেলার জন্য, এরপরেও খেলে গেছেন। লড়ে গেছেন নিজের সবটুকু দিয়ে, কারো চোখে করুনার পাত্র না হয়ে পারফর্ম করেই দলে টিকেছেন হাজারবার, ফিনিক্স পাখির মতই ফিরে এসেছেন বারবার! অথচ শেন বন্ড, ফ্লিনটফের মতো গ্রেটরা ঝড়ে গেছেন, অপারেশনের ভয়ে। উনি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিলেন সব আশংকা, দেশের জন্য লড়ে গেছেন অজস্রবার। ইনজুরির সাথেই এত বছরের প্রেম!

ক্যারিয়ার জুড়েই তার উত্থান-পতন। ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পান, কিন্তু বিধিবাম! প্রথম টেস্টেই ইনজুরির জন্য দল থেকে ছিটকে গেলেন। পরের বছরই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো রঙিন জার্সিতে নেতৃত্বের সুযোগ পেলেন। দ্বিতীয় ম্যাচেই ব্রিস্টলে ব্রিটিশদের হারিয়ে দেন, বাংলাদেশ পায় টেস্ট প্লেয়িং সব দেশের বিপক্ষে জয়ের স্বাদ। সে বছর আইরিশ আর নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের হয়ে অধিনায়কত্ব করেন৷

২০০৮ সালে নিউজল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট খেলার সময়কার একটি মুহূর্ত

মাশরাফির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে সময় এর পরের বছরই, চোটের কারণে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে সুযোগ পেলেন না। অথচ নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছেন। এক মাসে ১২ কেজি কমিয়েছেন কিন্তু অজানা কারনে শেষপর্যন্ত দলে ডাক পাননি। এরপরেও দমে না গিয়ে লড়ে গেছেন, দলে জায়গা পেয়েছেন। ২০১৪ সালে দ্বিতীয় দফায় লাল সবুজের জার্সিতে অধিনায়কত্বের সুযোগ পান। ঠিক পরের বছরই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে বিশ্বকাপের কোয়াটারে নিয়ে যান। এরপর বাঘেদের হুংকারে ঘরের মাঠে পাকিস্তান কে ১৬ বছর পর হারানোটাও তার হাত ধরে, চিরশত্রু পাকিস্তানকে বাংলাওয়াশের স্বাদ টাও তার অধীনেই এসেছে। তারপরে সিরিজ বাঁচাতে পারেনি ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকারাও। ২০১৭ তে প্রথমবারের মতো আইসিসি অনুষ্ঠিত কোন বড় ইভেন্টের সেমিফাইনালে মাঠে নেমেছিলো বাংলাদেশ, এবং তা এই মানুষটার অধীনেই। বাংলাদেশের ইতিহাসের একমাত্র আন্তর্জাতিক শিরোপাও এসেছে উনার নেতৃত্বেই!

আরেকবার পিছনে যাই,

২৬ শে ডিসেম্বর ২০০৪!
বিজয়ের মাস, গৌরবের মাস, অহংকারের মাস।

এই দিনেই টাইগারদের সাথে সেই সময়ের অন্যতম সেরা টিম ভারতের ম্যাচ ছিলো। অহংকারে ভরা দলটার অপেনার শেওয়াগ ত প্রথম থেকেই বাংলাদেশ কে হেয় চোখে দেখতে লাগলো। আর তার এই মানুসিকতাই একজনের বুকে শেল হয়ে বিঁধলো, বয়সে তরুন হলেও বাইশ গজে দেশের জন্যে নিজের সর্বোচ্চ দিয়েই লড়ে গেলেন। মাঠেই তিনি তার জাদু দেখাতে শুরু করেন, ব্যাট হাতে শেষের দিকে নেমেও অপরাজিত ৩১ করেন আর বল হাতে আউট করলেন ধোনি এবং বাংলাদেশ কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা সেহওয়াগকে।বিজয়ের মাসে বাংলাদেশও পায় আরো একটি বিজয়, বয়সে ছোট় হলেও ম্যাশকে ভালোবাসা টা সেইসময় থেকেই শুরু। যতই বড় হতে লাগলাম মানুষটার প্রতি ভালোবাসাটাও তত বাড়তে লাগলো!

এরপর ২০০৭ এ বিশ্বকাপের মঞ্চ!
প্রতিপক্ষ সেই ভারত, দিন টা ১৭ ই মার্চ। এ ম্যাচেও শেওয়াগের চোখে বাংলাদেশ অর্ডিনারী টিম। আর সেদিন বিশ্বকাপের মঞ্চে জাতীয় সঙ্গীত বলার সময় যে ছেলেটার চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়েছিলো, সেই ছেলে টা এবারো বললো, “ধরে দিবানি।”

সেদিন একাই তুলে নিয়েছিলেন ভারতের মূল্যবান ৪ উইকেট। ট্রফি জিততে আসা একটা দলকে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় হতে হয়েছিলো এই মানুষ টার জন্যে। অহংকারী শেহওয়াগ কে এবারো তিনি আউট করে প্রমান করে দেন, বাংলাদেশ কারো নিকট মাথা নোয়ায় না। অথচ মাঠে নামার আগে নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে হারানোর দুঃসংবাদ পেয়েছিলেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অন্যতম প্রতিভাবান অলরাউন্ডার মাঞ্জারুল ইসলাম রানা বাইক এক্সিডেন্টে পরপারে! শোককে শক্তিতে পরিণত করা হয়তো ইহাকেই বলে?

এরপর ২০১১ সাল!
ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ, নিজের চেনা আঙ্গিনায় ক্রিকেটের সবচেয়ে মর্যাদাকর আসর, স্বপ্ন দেশের হয়ে আরেকবার বল হাতে মাঠ কাঁপাবেন, কিন্তু বাধ সাধলো ইঞ্জুরি। গোটা ক্যারিয়ারে কম ত ভোগায় নি এই জিনিষ টা!

এরপরেও ইঞ্জুরি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। মাত্র এক মাসের ভিতরে ১২ কেজি ওজন কমিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বিধি বাম! এরপরেও দলে জায়গা হয় নি। মিরপুরের মাঠে বাচ্চা শিশুর মতো কেঁদে ছিলেন। কাঁদিয়ে ছিলেন গোটা জাতিকে। যে মানুষ টা দেশের জন্যেই প্রতিনিয়ত নিজেকে এক অনিশ্চিয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে, সেই মানুষ টাই যদি দেশের মাঠে বিশ্বকাপে না খেলতে পারে তাহলে কষ্টের পরিমাণ টা কতটুকু বলতে পারবেন?

এরপরেও সব ভুলে তিনি আবারো বাংলাদেশের হয়ে মাঠে নামেন, নিয়মিত লড়াই করেন, দেশকে আনন্দে ভাসান। তবে দরকার ছিলো একটা প্লাটফর্মের , যেটা তিনি পান ২০১৪ তে। ওই বছর টা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যে ছিলো হতাশাময়, সেখানেই তিনি দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে সব শুরু করেন।

“Maahrafe is the most amazing sportsman i have ever seen. It sounds like a miracale that he has been playing for years after tearing both of his knee ligaments”

—————————— Dr. David Young

মাশরাফি বিন মোর্ত্তাজা সম্পর্কে একবার সাকিব আল হাসান বলেছিলেন,

“বোলার কৌশিক ভাইয়ের কথা বাদ দেন। ব্যাটসম্যান মাশরাফির কথা ভাবেন শুধু। বাংলাদেশের হয়ে কত রান করেছেন উনি? হাজার দেড়েক। এই দেড় হাজার রান দিয়ে উনি বাংলাদেশকে যে কয়টা ম্যাচ জিতিয়েছেন, তা আমরা তিন-চার হাজার রান করে করতে পারিনি। ওনার ১৫ রান মানেই ম্যাচে আমরা এগিয়ে গেলাম। শোনেন, একটা কথা বলি। কৌশিক ভাই নিজেকে নিয়ে খামখেয়ালি না করলে সে থাকত বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার। কৌশিক ভাই কত বড় অলরাউন্ডার হতে পারতেন, উনি নিজেও জানেন না।
আবার বোলার হিসেবে উনার অবদান দুই রকমের। উনি আমাদের অনেক ম্যাচ জিতিয়েছেন, অনেক ম্যাচে আমরা অন্য কারো উপর ভর করে ম্যাচ জিতেছি। কিন্তু শুরুর ব্যাক থ্রুটা উনিই এনে দিয়েছেন৷ আবার দেখেন, উনাকে ইঞ্জুরির সাথে স্ট্রাগল করতে হয়েছে, ফেরার পর রিদমে আসতে হয়েছে৷ বাংলাদেশ পেসারদের জন্য মোটেই অনুকূল নয়। উইকেট থেকে কোন সাহায্য পাবেন না। এরপরেও আজকের ছেলেরা উনাকে দেখে শিখছে। এই তাসকিন, রুবেল, মুস্তাফিজ সবার আদর্শ দেখবেন উনি। আমি টেকনিক্যালি উনাকে অনেক বড় বোলার মনে করি। উনার জন্যেই আজকে আমাদের দলে তিন-চারটে পেসার আছে। একজন মানুষের জীবনে এরচেয়ে আর বড় অবদান কি রাখতে পারে?”

রাজনীতি, ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে সবকিছু মিলিয়ে উনার সমালোচক আজ চারদিকে ছড়িয়ে। দু’দিনের বাচ্চা ছেলেটাও বলে বেড়ায় মাশরাফি বাংলাদেশের ক্রিকেটে কি করেছে?

অথচ আমাদের কাছে মাশরাফি নাম টা অনেক বড়, উনাকে বুঝতে হলে উনার পরিসংখ্যান নিয়ে বসতে হবে না। আমাদের ক্রিকেটে উনার অবদান নিরপেক্ষ ভাবে দেখলেও আপনি বুঝে যাবেন৷ হাজার টা ইঞ্জুরি নিয়ে করুনার পাত্র না হয়ে সমানতালে পারফর্ম করেই দলে টিকেছেন বারবার। হাল ছাড়েন নি, অনুপ্রেরণা নিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে। ঘাড়ের রগ টা বাকা করে চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন, কলার টা উঁচু করে দৌড়ে এসেছেন।

সবাইকে নিয়ে গুছিয়ে লেখা যায় না, আটকে যায়, বুকটা মুচড়ে উঠে হারাবার বেদনায়, অবসরের ঘড়ি টা টিক টিক করে বেজে উঠে।

মাশরাফি মানে একটা মহাকাব্য, একটা চেতনা!
শুভ জন্মদিন গুরু ❤