বুনো উল্লাসে মেতে ওঠা কোঁকড়ানো চুলের মার্সেলো

0
44

কোঁকড়ানো চুলের ব্রাজিলিয়ান লেফটব্যাক। কিছুটা পাগলাটে, ক্ষ্যাপাটেও। দলের সাফল্যে বুনো উল্লাসে মেতে ওঠেন প্রায়ই। বয়স আর ফর্ম এখন পড়তির দিকে। কিন্তু নিজের প্রজন্মের সেরা লেফটব্যাক ত বটেই, সেরা ডিফেন্ডারদের তালিকা করলেও ওপরের দিকেই থাকবে নাম। ডিফেন্ডার হলেও অনেক উইঙ্গারদের চেয়েও বেশ পটু আক্রমণের বেলায়। কার কথা বলা হচ্ছে সেটা বোধ হয় আর বুঝতে বাকি নেই। হ্যাঁ, বলছিলাম মার্সেলোর কথা।

১৯৮৮ সালের ১২ই মে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে জন্মগ্রহণ করেন মার্সেলো ভিয়েরা ডা সিলভা জুনিয়র। দমকলকর্মী বাবা আর অবসরপ্রাপ্ত মায়ের অভাবের সংসারেই জন্ম মার্সেলোর। মার্সেলোর কথা অনুযায়ী, “ছোটবেলায় বাবা কাজ থেকে ফেরার পর আমাকে তার জামাগুলো দেখাতেন। আমি জানতাম বাবা কখনোই চাইতেন না আমি উনার মতই দমকলকর্মী হই, কারণ তারা সবাই ছিল খুবই গরিব। তবে আমার সেরকম ইচ্ছা কখনোই ছিল না। আমার ইচ্ছা ছিল কেবল ফুটবল খেলে বেড়ানো। ছোটবেলায় থেকেই আমাকে পাওয়া-না-পাওয়ার মধ্য দিয়েই বড় হতে হয়েছে। আমি শিখতে পেরেছি জীবনে যেকোনো পরিস্থিতিতে খুশি থাকতে হবে, অন্তত চেষ্টাটা করতে হবে। এই শিক্ষাটা জীবনেও প্রয়োগ করেছি আমি, লকার রুমেও চেষ্টা করি ছড়িয়ে দিতে। কারণ, খুশি থাকাতে পারাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু।”

ছোটবেলায় থেকেই নিজের ভালোবাসা ফুটবলের সাথেই বড় হয়ে উঠতে থাকেন মার্সেলো। রাস্তাঘাট আর বিচে ফুটসাল খেলেই হয় শুরুটা। ৯ আর ১৩ বছর বয়সে ব্রাজিলের বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব ফ্লুমিনেন্সে ফাইভ-এ-সাইড ফুটবল খেলতেন মার্সেলো। তবে ক্লাবটা প্রায় ছেড়েই দিতে হচ্ছিল মার্সেলোকে, কারণ ট্রেনিংয়ে যাওয়ার বাস ভাড়াটাও ছিল না তার কাছে। তবে একাগ্রতা আর নিজের সামর্থ্য দিয়েই লড়ে গেছেন নিজের ভালোবাসার ফুটবলের জন্য। শৈশবের ক্লাব ফ্লুমিনেন্স অনেক সাহায্য করেছিল মার্সেলোকে। মার্সেলোর অনেক প্রয়োজনেও পাশে দাঁড়িয়েছিল ক্লাবটা।

দ্রুতগতির আক্রমণাত্মক ফুলব্যাক হিসেবেই পরিচিতি পেতে থাকেন মার্সেলো। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছিল তার খ্যাতি। অনেকগুলো ক্লাব তাকে পাওয়ার দৌঁড়ে থাকলেও শেষমেশ জয়ী হয় রিয়াল মাদ্রিদ। ২০০৭ সালের জানুয়ারির ট্রান্সফার উইন্ডোতে বর্তমান ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে নাম লেখান মার্সেলো। মার্সেলোর বিশ্বতারকা হয়ে ওঠার গল্পটাও শুরু হয় এরপরই।

একদম শুরুর দিকে একাদশে কম সুযোগ পাওয়া মার্সেলো নিয়মিত হয়েছেন ধীরে ধীরে। ফুলব্যাক হলেও আক্রমণে বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখেন মার্সেলো। এখন পর্যন্ত রিয়ালের হয়ে ৫২৭ ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ৩৮ টা। তবে মার্সেলোর সবচেয়ে অনন্য দিকটা বোধ হয় আক্রমণে দারুণ ভূমিকা রাখাটাই। একজন উইঙ্গারের যা যা স্কিল থাকা উচিত তার প্রায় সবকয়টাই আছে মার্সেলোর মাঝে, কয়েকটা ক্ষেত্রে হয়ত বেশিও আছে। ক্রস, স্পিড, শট, পাস, ড্রিবল, উইক ফুট এবিলিটি, ফিনিশিং কী নেই মার্সেলোর? বহু ম্যাচে এমনও হয়েছে মার্সেলো লেফটব্যাক নাকি লেফট উইঙ্গার সেটা বোঝাই হয়ে গেছে কঠিন। এক্কেবারে যেন ফুটবলের অলরাউন্ডার।

নিজের একদম স্বর্ণালি সময়টা কিছুটা পেছনে ফেলে এসেছেন মার্সেলো। বিশেষ করে রিয়াল মাদ্রিদের টানা ৩ ইউসিএল শিরোপা জয়ে লেফট সাইডে মার্সেলো আর রোনালদোর রসায়নটা রেখেছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। একের পর এক আক্রমণ শাণিত করা গেছে, সফলও হয়েছে রিয়াল। সমসাময়িক অন্য অনেকের চাইতে এ জায়গাটাতেই হয়ত অনেকটা এগিয়ে গেছেন মার্সেলো। নিজের প্রজন্মের সেরা লেফটব্যাক তাই বলাই যায় তাকে। কিংবদন্তি লেফটব্যাক রবার্তো কার্লোসও নিজের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নিয়েছেন মার্সেলোকেই।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ব্রাজিলের হয়ে ৫৮ ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ৬ টা। বর্তমানে ব্রাজিল জাতীয় দলের বাইরে আছেন তিনি। সবশেষ ম্যাচ খেলেছেন ২০১৮ সালের ৬ই জুলাই।

খেলোয়াড়ি জীবনে রিয়ালের হয়ে ৫ টা লালিগা, ২টা কোপা ডেল রে, ৪ টা সুপারকোপা, ৪ টা চ্যাম্পিয়নস লিগ, ৩টা উয়েফা সুপার কাপ আর ৪ টা ক্লাব বিশ্বকাপ জিতেছেন মার্সেলো। ব্রাজিলের হয়ে ২০০৫ অ-১৭ বিশ্বকাপে রানার্স আপ আর ২০১৩ কনফেডারেশনস কাপে হয়েছেন চ্যাম্পিয়ন, খেলেছেন ২০১৪ আর ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে। ফিফা ফিফপ্রো বিশ্ব একাদশে জায়গা পেয়েছেন ৬ বার, ইউসিএল এর সেরা একাদশেও ৪ বার জায়গা পেয়েছেন।

তবে নিজের সেরা সময়টা পেছনে ফেলে এসেছেন মার্সেলো। বয়স, ফর্ম কোনোটাই এখন আর পক্ষে নেই। সেই পুরোনো আগুনে ফর্মের মার্সেলোকে হয়ত আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া যাবে না। কিন্তু নিজের ক্যারিয়ারে যা দেখিয়েছেন সেটার জন্যই বিশ্ববাসী তাকে মনে রাখবে আজীবন। মাদ্রিদিজমে টইটুম্বুর পাগলাটে এই ফুটবলারকে ভুলে যাওয়ার কোনো উপায় আছে কী? মার্সেলোর আগামী দিনগুলো সুন্দর হোক।