ক্রিকেটের রাজপুত্তুর লারার গল্প

0
32

“ডিড আই এন্টারটেইন ইউ?”

এন্টিগুয়ার সেন্ট জোন্সে চতুর্থ টেস্টের তৃতীয় দিনের খেলা চলছে। প্রথম ইনিংসের ২০২ তম ওভারে গ্যারেথ ব্যাটির বলে লেগসাইডে নিখুঁত সুইপ করে সোজা দৌড় দিলেন। ৭৭৮ মিনিটের দীর্ঘ অপেক্ষায় অবশেষে পৌছে গেলেন স্বপ্নের শেষ সীমানায়। প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ৫৮২ বলে ৪৩ চার ও ৪ ছয়ে ৪০০ রান! বাকরুদ্ধ মাইকেল ভন, অবিশ্বাস্য এক মাইলফলকের ছোঁয়ায় ততক্ষনে প্রশংসার জোয়ারে ভাসছেন ব্রায়ান চার্লস লারা।

একদম শুরুতে যাওয়া যাক,

শৈশবেই হার্ভার্ড কোচিং ক্লিনিক নামের এক ক্রিকেট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ক্রিকেটের হাতেখড়ি। যে বয়সে বই হাতে স্কুলে যাওয়ার কথা সেই বয়সেই ব্যাটে-বলের সখ্যতা শুরু। শুধু যে ক্রিকেটেই মুন্সিয়ানা দেখাতেন ব্যাপারটা এমন না, ভালো ছিলেন ফুটবল আর টেবিল টেনিসেও। কিন্তু যার গল্প হবে ব্যাট হাতে বিশ্ব শাসনের, তার শেষ ঠিকানা তো হবে বাইশগজের খোলা ময়দানেই।

বয়স তখন মাত্র চৌদ্দ, হ্যারি রামদাসের অধীনে বাবার আদরের “প্রিন্স” থেকে ব্রায়ান লারা হওয়া শুরু। ১২৬.২৬ গড়ে ৭২৪ রান, আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতা থেকে সরাসরি ত্রিনিদাদের অনূর্ধ্ব-১৬ দলে। এক বছর পরই ডাক পান ওয়েস্ট ইন্ডিজ অনূর্ধ্ব ১৯ দলে। বয়স টা কেবল ১৫, লম্বা যাত্রার প্রাথমিক কার্যক্রম ততোদিনে শুরু হয়ে গেছে। ১৯৮৭ সালে ক্যারিবিয়ানদের যু চ্যাম্পিয়নশীপে ভেঙ্গে ফেললেন কার্ল হুপারের ৪৮০ রানের রেকর্ড, থামলেন ৪৯৮ রানে।

পরের বছর আবারও লারার ব্যাট হাতে নান্দনিক শিল্প, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর হয়ে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে নিজের দ্বিতীয় ম্যাচেই বার্বাডোসের বিপক্ষে ৩০০ মিনিটেরও বেশী সময় ক্রিজে থেকে খেলে ফেললেন ৯২ রানের এক ম্যারাথন ইনিংস। প্রতিপক্ষের বোলিং লাইনআপ টা একটু যেনেন নিন, দুই কিংবদন্তি ম্যালকম মার্শাল আর জোয়েল গার্নার। একই বছরই ভারতের অনূর্ধ্ব ২৩ দলের বিপক্ষে খেলেন আবারো লম্বা এক ইনিংস, অধিনায়ক হিসেবে ১৮২ রান। একের পর এক নান্দনিক সব ইনিংস খেলে ততোদিনে চারদিকে নাম ছড়িয়ে গিয়েছে। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো সুযোগ পেয়ে যান ওয়েস্ট ইন্ডিজের জাতীয় দলে।

তবে সুঃখের অপর পিঠেই দুঃখ হাসে, জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার খবর টা পেয়েছিলেন বাবার ফোনে, সেই বাবাই মৃত্যুবরন করলেন লারার ব্যাট হাতে শাসন না দেখেই। ক্যারিয়ারের শুরুতেই বড় ধাক্কা, নিজেকে সরিয়ে নিলেন জাতীয় দল থেকেও।

তবে শোককে শক্তিতে পরিনত করতে জানতেন লারা। ব্যাট হাতে কিভাবে সুখ খুঁজতে হয় তা জানতেন বলেই আবারও বাইশগজে ফিরেছিলেন। ১৯৯০ সাল থেকে ২০০৭, মাঝের ১৭ বছর একটা দেশকে একা টেনে নেওয়ার গল্প, ব্যাট হাতে অবিশ্বাস্য সব কীর্তি গড়ার গল্প, “ছোট্ট প্রিন্স ” থেকে ক্রিকেটের রাজকুমার হওয়ার গল্প। একজন লারার গল্পের শেষ নেই, যার কীর্তি নিয়ে লিখতে বসলে কেটে যাবে সারারাত!

ক্যারিয়ারের শুরুটা করেছিলেন একদম বাজেভাবে, সেখান থেকে পঞ্চম টেস্টে এসে সেঞ্চুরির দেখা পান। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আসার আগেই যার ব্যাট হেসেছে বড় ইনিংসের ছোঁয়ায়, বড় মঞ্চে লম্বা ইনিংস না খেলে সে থেমে থাকবেই বা আর ক’দিন? সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে সেই ম্যাচে ক্রেইগ ম্যাকডারমট, মার্ভ হিউজ, শেন ওয়ার্নদের মতো বোলারদের পিটিয়ে ছাতু বানিয়ে করে ফেললেন ২৭৭ রানের এক মহাকাব্যিক ইনিংস। অভিষেক টেস্ট সেঞ্চুরিতেই এতো বড় ইনিংসের হিসেবে লারার এই মাইলফলক চতুর্থ স্থানে, আর সম্ভবত ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্টও! সেদিন লারার এতই খুশি হয়েছিলেন যে পরবর্তীতে এই ইনিংসকে জীবন্ত করে রাখতে নিজের মেয়ের নাম রাখেন “সিডনি”।

তবে লারার গল্প সেখানেই থেমে থাকে নি, পরের বছরই ২৬ বছরের পুরোনো রেকর্ড কিংবা সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি স্যার গ্যারি সোবার্সের ৩৬৫ কে টপকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করে ফেললেন ৩৭৫ রান।

একই বছরই অ্যাজবাস্টনে ইংলিশ কাউন্টিতে উস্টারশায়ারের হয়ে ডারহামের বিপক্ষে খেললেন এক মহাকাব্যিক ইনিংস। ৪২৭ বলে ৪৭৪ মিনিট কাটিয়ে ৬২ চার এবং ১০ ছয়ে ৫০১ রানের এক পাহাড় গড়লেন, প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে যে পাহাড়ের চূড়ায় পৌছাতে পারে নি আর কেউ!

ব্যাট হাতে নান্দনিক সব পুল শট, ব্রায়ান লারা কখনো বড় ইনিংস খেলে দলের মান বাচিয়েছেন, তো কখনো ধুমধাড়াক্কা পিটিয়ে এন্টারটেইনিংয়ের রাজা বনে গেছেন। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্টে ৩৮০ রানের ইনিংস খেলে ম্যাথু হেইডেন যখন লারার রেকর্ড ভেঙে ফেললো, হয়তো তখন আবারও নিজের জাত চেনানোর জন্য অপেক্ষা করছিলেন ব্রায়ান চার্লস লারা। ৬ মাস না পেরোতেই ভেঙে ফেলেন হেইডেনের রেকর্ড, সেই এন্টিগুয়ায় সেন্ট জোন্স, প্রতিপক্ষও সেই চিরচেনা ইংল্যান্ড, শুধু লারাই যেনো আরো পরিনত আরো ভয়ংকর। চারশো রানের এক ভুতুড়ে ইনিংস, কিংবা চোখের সৌন্দর্য, একজন লারা, ক্রিকেটের জাদুকর!

একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে দুইটা ৩৫০+ রানের ইনিংস থেকে একমাত্র অধিনায়ক কিংবা ক্রিকেটার হিসেবে ৪০০ রান। রেকর্ডের বরপুত্রের অর্জন, সাফল্যমণ্ডিত ক্যারিয়ার।
একই টেস্টে সেঞ্চুরি ও ডাবল সেঞ্চুরির বিরল রেকর্ডের মালিক একমাত্র লারা। আবার টেস্টে পরাজিত দলের হয়ে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডও এই গ্রেটের।

সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান কে? ডন ব্র‍্যাডম্যান নাকি শচিন টেন্ডুলকার? লারাও কি থাকবেন সেই বিতর্কে? কে জানে! তবে রান তাড়ায় নার্ভ ধরে রাখার কীর্তিতে ব্রায়ান লারা যে আর সবার চেয়ে ঢের এগিয়ে।

” তার ব্যাটিং দেখার জন্য প্রয়োজনে আমি পয়সা খরচ করবো”
— রাহুল দ্রাবিড়।

ভারতীয় গ্রেটের এই কথার যথার্থতা পাওয়া গিয়েছে অনেকবারই। ১৯৯৯ সালের ফ্রাঙ্ক ওরেল ট্রফিতে। ১-১ এর সমতা নিয়ে তৃতীয় টেস্ট শুরু। প্রথম টেস্ট হয়েছিল পোর্ট অফ স্পেনে, যেখানে ৩৬৪ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ৫১ রানে অল-আউট। ওয়েস্ট ইন্ডিজ হারলো ৩১২ রানে। পরের টেস্টে ব্রায়ান লারার ২১৩ রানের ইনিংস, ১০ উইকেটের বড় জয়ে সিরিজে সমতা ক্যারিবিয়ানদের৷

বার্বাডোজের কেনসিংটন ওভালে সিরিজের তৃতীয় টেস্টে পন্টিংয়ের সেঞ্চুরি আর অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহর ১৯৯ রানে প্রাথমিক ধাক্কা সামলে এরপরে প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া সংগ্রহ ৪৯০। জবাবে শুরুতেই ওপেনার আদ্রিয়ান প্যাভিলিয়নে, দলীয় ৬৪ রানেই ৪ উইকেট নেই। আগের ম্যাচের ডাবল সেঞ্চুরিয়ান অধিনায়ক লারা থেমে গেলেন ৮ রানে। একপ্রান্তে ক্যাম্পবেলের সেঞ্চুরি আর জ্যাকবসের ফিফটি আর শেষদিকে এম্ব্রোসের লেজের দিকে লড়ে যাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ অল-আউট হয়ে গেলো ৩২৯ রানে, ১৬১ রানের বড় লিড স্টিভ ওয়াহর দলের। জবাবে ব্যাট করতে নেমে আগের ইনিংসে নির্জীব থাকা ওয়ালশের বিধ্বংসী বোলিং, ৫ উইকেটের ম্যাজিক্যাল ফিগার। ১৪৬ রানেই এবার থেমে গেলো অজিদের রানের চাকা। এরপরেও দুই ইনিংসের হিসেব মিলিয়ে অজিদের সংগ্রহ ৩০৭। চতুর্থ দিনে ক্যারিবিয়ানদের সামনে ৩০৮ রানের বড় টার্গেট।

পৃথিবীর যেকোনো দলের জন্যই টেস্টের শেষ দুইদিনে ৩০০ র উপরে রান নেওয়া টা অবিশ্বাস্য, সেখানে জয়ের আশা করাটাও কল্পনা বলা যায়। পিচ ততক্ষণে হয়ে গেছে বোলিং স্বর্গ, বিপক্ষের দলে আছেন ম্যাকগ্রাথ, ওয়ার্ন, গিলেস্পিদের মতোন ব্যাটসম্যানদের জন্য যমদূতেরা। সবাই ধরেই নিয়েছিলো হয় টেস্ট ড্র হবে, না হয় অজিদের পকেটে চলে যাবে। কিন্তু ব্রায়ান লারার মাথায় হয়তো অন্যকিছু চলছিলো।

উদ্ভোধনী জুটিতে ক্যারিবিয়ানদের সংগ্রহ ৭২, দ্বিতীয় উইকেট পরে গেলো ৫ রান পরেই। এরপরই নামলেন একজন ব্রায়ান চার্লস লারা, গল্পের শুরু সেখান থেকেই৷ খাদের কিনারা থেকে অবিশ্বাস্য এক কীর্তি, কিংবা ফিনিক্স পাখির মতোন ক্যারিবিয়ানদের ফিরে আসা, এখানে ফিনিক্স টা লারা, চীনের রুপকথা ওয়েস্টইন্ডিজ আর এই নির্মমতার স্বীকার স্টিভ ওয়াহর মাইটি অস্ট্রেলিয়া। চতুর্থ দিন শেষ হলো ৮৫/৩ এ। পরের দিন স্বাগতিকদের প্রয়োজন ২২৩, সফরকারীদের জন্য ৭ উইকেট। জয়ের পাল্লা টা ওয়াহর দলের দিকেই বেশী ঝুঁকে ছিলো, কিন্তু ঐ যে একজন লারা, ফিনিক্স পাখি যে তখনো বাইশগজে। পরের দিন শুরুতেই ক্যারিবিয়ানদের ২ উইকেট নেই। ১০৫/৫ থেকে ২৩৮/৬।

আগের টেস্টেই ৩২২ রানের জুটি গড়া লারা – অ্যাডামস এবার করলেন ১৩৩। তবে জয়ের গল্পটা তখনও বাকি। একদিকে ক্যারিবিয়ানদের আসা যাওয়ার মিছিল, অন্যপাশে ব্রায়ান লারার টিকে থাকা। বাড়তি পাওনা হিসেবে অজি বোলারদের আগুন ঝড়া বোলিং ও ভয়ংকর সব স্লেজিং। বল সামলাবেন না স্লেজিংয়ে মাথা ঠান্ডা রাখবেন, চ্যালেঞ্জের যেনো প্রতিযোগিতা বসে গিয়েছিলো সেদিন। তবে শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে যখন অপর প্রান্তে কোর্টনি ওয়ালশ, অন্যপাশে গিলেস্পির বলে সোজা বাউন্ডারি মেরে দিলেন লারা৷ ১৫৩ রানের অপরাজিত এক ইনিংস, লড়ে যাওয়ার গল্প। যে গল্প হার মানাবে কোনো থ্রিলার মুভিকে। থ্রিলিংয়ের জন্য পড়তে হবে না শার্লক হোমস, লারার সেদিনের সেই ইনিংসের প্রতিটা মুহুর্ত যেনো জমে ছিলো থ্রিলিংয়ে।

এ্যাশেজে স্টোকসের অপরাজিত ১৩৫, দঃ আফ্রিকার বিপক্ষে কুশাল পেরেরার অপরাজিত ১৫৩ নাকি অজিদের বিপক্ষে ব্রায়ান লারার সেই অবিশ্বাস্য ১৫৩। তর্ক হবে অনেক, কিন্তু সর্বকালের সেরা রান তাড়ার গল্পে হয়তো লারাকে ছাড়াতে পারবেনা আর কেউ।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৪৩০ ম্যাচে ২২৩৫৮ রান
১১১ টা অর্ধশতক আর ৫৩ টা শতক। ২ টা ত্রিপল সেঞ্চুরির সাথে ৯ টা ডাবল সেঞ্চুরি।

ক্যারিয়ারের শেষ ইনিংস খেলে সবার জন্য যখন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন ” ডিড আই এন্টারটেইন ইউ? ” হয়তো ক্রিকেটের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তের সব ক্রিকেট ভক্তরা বলেছিলো হ্যাঁ, আপনি আমাদের আনন্দ দিয়েছেন। আপনি আমাদের শৈশব থেকে কৈশোর রাঙিয়েছেন। ঐ বাইশগজের রাজত্ব টা আপনার, পরের জেনারেশনকে আপনার গল্প বলে দিন পার করা যাবে। কোনো এক বিকেলে কফির মগ হাতে আপনার কোনো ব্যাটিং দেখে সময় পার করা যাবে।