বাইশগজের ‘দ্য ওয়াল’, একজন রাহুল দ্রাবিড়

“শচিন টেন্ডুলকারের যদি হয় উদ্যমী, তবে দ্রাবিড় একজন স্থির সংকল্পের অধিকারী। বাইশগজের জন্য দ্রাবিড় একজন বিজ্ঞানীর মতোন। তার ব্যাটিংয়ের ধরন হয়তো একটু আলাদা, তবে এভাবেই তিনি দেশকে ১৫ বছরের উপরে সার্ভিস দিয়ে গেছেন। টেন্ডুলকার হতে পারে একজন ফর্মূলা ড্রাইভার কিংবা গোলবারের সামনে একজন স্ট্রাইকার৷ কিন্তু দ্রাবিড়ের ভূমিকা টা বাইশগজে একজন অলিম্পিক শ্যুটারের মতোন, যার লক্ষ্যভেদ একদম সুনির্দিষ্ট।”

জনপ্রিয় ধারাভাষ্যকার ও ক্রিকেট বিশ্লেষক হার্শা ভোগলের উক্তিটা ছিলো এমনই, আর যাকে নিয়ে করেছিলেন বাইশগজে তিনি প্রায় দুই দশক ব্যাট হাতে রাজত্ব করে গিয়েছিলেন৷ দলের জন্য ঢাল হয়ে প্রতিপক্ষের সব আক্রমণ রুখে দিতেন৷ স্বভাবতই তার নাম হয়ে গিয়েছিলো “দ্য ওয়াল”।

Image result for rahul dravid batting

বাবা ছিলেন এক জ্যাম কোম্পানির কর্মকর্তা। মা ছিলেন অধ্যাপিকা। ১৯৭৩ সালের ১১ জানুয়ারী
এমনই ছিমছাম গোছানো এক মারাঠি পরিবারে জন্মেছিলেন রাহুল সারদ দ্রাবিড়। শৈশবে প্রচুর জ্যাম খেতেন বলে তাকে অনেকেই “জ্যামি” বলে ডাকতেন।

স্কুল ক্রিকেট দিয়ে শুরু করে এক সামার ক্যাম্পে তিনি নজর কেড়েছিলেন সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার কেকি তারাপোরের৷ তারপর কর্ণাটকের হয়ে অনূর্ধ্ব ১৫ থেকে ১৯ দলেও খেলেছেন৷

তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পদার্পণ করার আগে রঞ্জি ট্রফিতে নজর কেড়েছিলেন। কলেজে থাকা অবস্থাতেই রঞ্জি ট্রফিতে অভিষেক ঘটেছিলো। কাকতালীয় ভাবে তার সাথে একই দলে ছিলেন সাবেক ভারতীয় কিংবদন্তি স্পিনার অনীল কুম্বলে। সেখান থেকেই জাতীয় দলে ডাক পেয়েছিলেন, অবিশ্বাস্য এক ক্রিকেট ক্যারিয়ারের যাত্রা টা শুরু তখন থেকেই!

১৯৯৬ সালে রঙিন জার্সিতে অভিষেক হয়েছিলো, তবে শ্রীলংকার বিপক্ষে সেই ম্যাচে নিজের জাত চেনাতে পারেনি। অথচ সাদা পোষাকের ফরমেটে অভিষেকেই বাইশগজ রাঙিয়েছিলেন। ঐ বছরই লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ৫ রানের দূরত্ব থেকে আউট হয়ে গিয়েছিলেন৷ একই বছরে দঃ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে বিপর্যস্ত হয়েছিলেন ভারত। এরপর তাকে ৩ নম্বর পজিশনে ব্যাটিংয়ের সুযোগ করে দেয় ভারতীয় ম্যানেজমেন্ট। আর সুযোগ পেয়েই তৃতীয় টেস্টে তুলে নিয়েছিলেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট শতক। পরের বছর ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে করেছিলেন প্রথম ওয়ানডে শতক৷

Related image

তবে শুধু ব্যাট হাতেই না, গ্লাভস হাতেও ভারতকে সার্ভিস দিয়েছিলেন অনেকদিন। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে কেনিয়ার বিপক্ষে শচিনের সাথে জুটি গড়ে করেছিলেন ২৩৮ রান। একই ম্যাচে নিয়মিত উইকেটরক্ষক “মঙ্গিয়ার” ইঞ্জুরির কারনে প্রথমবারের মতোন গ্লাভস হাতে স্ট্যাম্পের পিছনে দাঁড়ান।

দ্রাবিড়-শচিন জুটি বিশ্বকে তাক লাগিয়েছিলেন আরো একবার। ঠিক পরের ম্যাচেই শ্রীলংকার বিপক্ষে করেছিলেন ৩১৮ রানের জুটি। যা এখনো বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ।

২০০১ সালে সহ-অধিনায়ক হিসেবে ইডেন গার্ডেনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভিভিএস লক্ষন কে নিয়ে ঐতিহাসিক ৩৭৬ রানের সেই অবিশ্বাস্য জুটি গড়েছিলেন। পরবর্তীতে ৪ বছর পর প্রথমবারের মতোন জাতীয় দলে নেতৃত্বের দায়িত্ব পান। ২০০৫ সালে সৌরভ গাঙ্গুলি অধিনায়কত্ব থেকে পদত্যাগ করলে দেশের ভার কাধে তুলে নেন বাইশগজের এই ভদ্রলোক। পরবর্তীতে ৬২ টা ওয়ানডে এবং ২০ টি টেস্টে দেশকে সামনে থেকে পরিচালনা করেন। ২০০৭ সালের বিশ্বকাপ থেকে প্রথম রাউন্ডেই ভারত বাদ পড়লে অধিনায়কের দায়িত্ব থেকে সরে দাড়ান।

“দ্রাবিড় তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে। তার ব্যাটিং, আদর্শ নিশ্চিত ভাবেই তরুণদের সফলতা বয়ে আনার জন্য কার্যকর”
———- দ্রাবিড় সম্পর্কে তার দীর্ঘদিনের পার্টনার শচিন টেন্ডুলকার।

১৬ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারে ১৬৪ ম্যাচে ৫২.৩১ গড়ে রান করেছেন ১৩,২৮৮। সেঞ্চুরি হাকিয়েছিলেন ৩৬ টা, অর্ধশতক ৬৩ টা। আর ওয়ানডেতে ৩৪৪ ম্যাচে ৩৯.১৬ এভারেজে ১২ সেঞ্চুরি আর ৮৩ ফিফটিতে রান করেছেন ১০,৮৮৯। দুই ফরমেটের ক্রিকেটেই ১০ হাজারের উপরে রান করা খুব কমসংখ্যক ব্যাটসম্যানদের একজন এই কিংবদন্তি ফিল্ডিংয়ের জন্যও ছিলেন বেশ জনপ্রিয়৷ স্রেফ টেস্ট ফরমেটেই ক্যাচ নিয়েছেন ২১০ টা, ওয়ানডেতেও প্রায় ২০০ ছুঁইছুঁই। এখানে শুন্য থেকে বল লুফেছেন ১৯৬ বার।

অনেকের জন্যই টেস্ট ক্রিকেট খাপছাড়া লাগলেও এই ক্রিকেটারের জন্য রাজকীয় এই ফরমেট যেনো ছিলো ক্রিকেটের জন্য আদর্শ প্লাটফর্ম। স্রেফ ১৬৪ টেস্টেই ৩১ হাজারের বলের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। প্রত্যেকটা ডাবল সেঞ্চুরিতে পূর্বেরটার চেয়ে রান বেশী করেছেন।

“তুমি যখন ভূপতিত হয়ে পরবে, তখন তুমি চেষ্টা করবে অন্য কারো উপর দোষ চাপিয়ে দেওয়ার, অজুহাত খোঁজার। অথচ তোমার জন্য এটা ভালো সুযোগ নিজেকে জানার, নিজের দোষ খুঁজে বের করে তা সংশোধন করার। আমি অনেক কিংবদন্তিদের সাথে খেলেছি, আমি তাদের দেখেছি কিভাবে তারা ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেয়। ত তুমি অবশ্যই নিজের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তীতে সফল হয়ে ঘুরে দাঁড়াবে।”

Image result for rahul dravid last match

২০১১ সালে শেষবারের মতো একদিনের ক্রিকেটে মাঠে নামেন, একই বছরে অবসর নেন আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকেও। পরের বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একদম অচেনা এক রাহুল দ্রাবিড় কে দেখেছে ক্রিকেট বিশ্ব। অজিদের বিপক্ষে ২য় টেস্টে দুই ইনিংস মিলিয়ে রান করেছিলেন মাত্র ২৬। সেই সিরিজে ভারতও হারে ৪-০ ব্যবধানে। নিজের শেষটা হয়তো তখনই দেখে ফেলেছিলেন ক্রিকেটের এই মহানায়ক। সময় ফুরিয়ে এসেছিলো, বেজে উঠেছিলো শেষের গান। অনেক ত হলো বাইশগজের যুদ্ধ, এবার তবে ঘরে ফেরার পালা, পরিবারকে একটু সময় দেওয়া!

২০১২ সালের মার্চে ব্যাঙ্গালোরে এক প্রেস কনফারেন্স ডাকেন। সবার সামনেই জানান নিজের সিদ্ধান্ত। অনেক ত হয়েছে আর কতো?

শুধু শেষবেলাতেও যেনো ছিলো কিছুটা অভিমান, “যে জায়গায় আমি ১৬ বছর ধরে ছিলাম, সেটা ছেড়ে দেওয়া এতো সহজ না। তবে আমি যা অর্জন করেছি তাতেই আমি খুশি, সময় এবার নতুন দের৷ এটাই উপযুক্ত সময়।”

তৎকালীন সময়ে সবগুলো টেস্ট প্লেয়িং দলের বিপক্ষেই সেঞ্চুরি হাকানো এই কিংবদন্তির আক্ষেপ বলতে ভারতের হয়ে কোন বৈশ্বিক শিরোপা না জিততে পারা।

তাছাড়া ক্যারিয়ারে অর্জনের ওজন টা বড্ড ভারী এই ভদ্রলোকের। ভারতের সর্বোচ্চ পদকের মধ্যে অন্যতম পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষন দুটোই ঝুলিতে পুরেছেন তিনি।

Image result for rahul dravid

এবার আসা যাক বাইশগজের “দ্য ওয়াল” খ্যাত এই ব্যাটিংস্তম্ভের কিছু ফ্যাক্ট নিয়ে।

  • আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টানা ১২০ ম্যাচে ০ রানে আউট হননি। আবার ৩০০ এর অধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা ক্রিকেটারদের মধ্যে সব থেকে কম বোল্ড আউট হয়েছেন দ্রাবিড়।
  • টেষ্ট ক্যারিয়ারে মাত্র একবারই ষ্টাম্পড আউট হয়েছেন। অনেকেই বলেন দ্রাবিড় ওয়ানডেতে তেমন কার্যকরী ছিলেন না তেমন৷ অথচ ১৯৯৯ থেকে ২০০৬ বছরের মধ্যে দ্রাবিড়ের থেকে বেশী ওয়ানডে নেই আর কোন ক্রিকেটারের।
  • ডন ব্রাডম্যানের পরে একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে ইংল্যান্ডের মাটিতে সাদা পোষাকে টানা তিন ইনিংসে সেঞ্চুরি করেছিলেন। আবার ৪ টা আলাদা টেষ্টে টানা সেঞ্চুরি করা ব্যাটসম্যানও তিনি।
  • অধিনায়ক হওয়ার পর তার নেতৃত্বে ভারত টানা ১৭ টা ওয়ানডে রান তাড়া করে জিতে৷ দক্ষিন আফ্রিকা থেকে শুরু করে পাকিস্তান। আফ্রিকার মাটিতে প্রথম টেষ্ট জয়, আর পাকিস্তানের মাটিতে তাদের বিপক্ষে প্রথম সিরিজ জয় দুটোই দ্রাবিড়ের সফল নেতৃত্বে৷ এমনকি ১৯৭১ সালের পরে লম্বা সময় ওয়েষ্ট ইন্ডিজের সাথে সিরিজ জিততে পারেনি ভারত, ২০০৬ সালে ভারত প্রথম ক্যারিবিয়ানদের মাটিয়ে বিজয়ের পতাকা উড়ায়, এখানেও নেতা হিসেবে সামনে থেকে কলকাঠি নারে একজন রাহুল সারদ দ্রাবিড়।

দ্রাবিড় যে শুধুই একজন গ্রেট ক্রিকেটার ছিলেন এমন না, বরং ভালো ক্রিকেটার ভালো কোচ হতে পারে না এই তত্ত্ব কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভারতের অনুজদের ঠিকই সঠিকভাবে পরিচর্যা করছেন। ২০১৫ সালে ভারতের অনূর্ধ্ব ১৯ দলের কোচের দায়িত্ব পান। এছাড়া রিশাভ পান্ত, করুন নায়ার, চেতেশ্বর পুজারা থেকে লোকেশ রাহুল সবাই এই ভদ্রলোকের হাতেই গড়া৷

Image result for rahul dravid coach

সম্প্রতি ভারতের অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ জয়েও ছিলেন কোচের ভূমিকায়। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে মূল দলের দায়িত্বেও থাকতে পারেন এই ভদ্রলোক।

“প্রথম ১৫ মিনিটের মধ্যে আপনি তার উইকেট নেয়ার চেষ্টা করবেন। যদি ব্যর্থ হোন, তাহলে বাকিদের উইকেট নেয়ার চেষ্টা করুন। কারন ততক্ষণে রাহুলকে আউট করাটা কল্পনার মতো হয়ে গেছে।”

দ্রাবিড় কে স্টিভ ওয়াহর এই উক্তি শুনেই বোঝা যায় ক্রিকেটিয় সেন্সে এই ভদ্রলোক কোথায় ছিলেন। কিংবা গোটা ক্যারিয়ারেই শচিনের জন্য আড়ালে ঢাকা পরা এই মানুষটাকে নিয়ে পাকিস্তানি গ্রেট পেসার শোয়েব আক্তার বলেছিলেন,

“শচীন নিঃসন্দেহে অবিশ্বাস্য ব্যাটসম্যান। তারপরও আমার কাছে সবচেয়ে নিখুঁত মনে হয় রাহুলকে। জমাট ব্যাটিং করে, শট খুব কম খেলে। যখেলায় ভুল করার সম্ভাবনা কম, তাই তাকে আউট করাও কঠিন হয়ে যায়।”

ক্যারিয়ারের শুরুতে ইন সুইংগারে আউট হতেন খুব। সেখান থেকেই স্রেফ অনুশীলনের জন্য “দ্য ওয়াল” বনে যান। প্রতিদিন নিজের অক্ষমতা, নিজের ভুলত্রুটি নিয়ে কাজ করেছেন, নিজেকে সর্বকালের সেরাদের কাতারে নিয়ে গিয়েছিলেন।

ক্রিকেটের বাইরে পরিবারকেও সনয় দিতেন। স্রেফ ভালোবেসেই বিয়ের পর স্ত্রীর জন্মদিনের সাথে মিল রেখে ১৯ নম্বর জার্সি পরে বাইশগজে ব্যাট হাতে শাসন করতেন।

” শুভ জন্মদিন মিঃ ডিপেন্ডেবল, দ্য ওয়াল রাহুল শারদ দ্রাবিড় “