বঙ্গদেশের রাজা ফিরুক মহারাজার বেশে

0
31

বাংলায় বহুল প্রচলিত একটা প্রবাদ বাক্য আছে, ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাণে’ আজকে আমার গল্পে যে মহানায়ক কে আপনাদের সামনে তুলে ধরতে যাচ্ছি তার জন্য আমি পুরনো এই প্রবাদ বাক্যটাতে সামান্য সংশোধন আনতে চাচ্ছি। আমার গল্পে ঢেঁকির রূপক হিসেবে যার চরিত্রায়ন করতে যাচ্ছি সে পাতালেও ধান ভাণে, সে স্বর্গে যাওয়ার পথেও ধান ভাণে আবার স্বর্গে গিয়েও ধান ভাণে। ১৮ কোটির বিশাল জনসংখ্যার ছোট ভূমিতে খুব কম সংখ্যক লোকই এসেছিল যারা দলমত নির্বিশেষে সকল শ্রেণী পেশার মানুষের মনে জায়গা নিতে পেরেছে। আমাদের আজকের এই মহানায়ক “সাকিব আল হাসান” তাদের ই একজন এবং অন্যতম একজন। ক্রিকেট পাগল জাতির মুখে মুখে তো একবার তাকে নিয়ে গানই রচিত হয়ে গিয়েছিল- ‘বাংলাদেশে জান, বাংলাদেশের প্রাণ। সাকিব আল হাসান , সাকিব আল হাসান।

মাগুরা থেকে উঠে আসা ফয়সালের একজন সাকিব আল হসান হয়ে উঠার গল্পটাও মসৃণ নয়। খুব কম সময়ের মধ্যেই তিনি জীবনের বহু রঙ দেখে ফেলেছেন। বেশ কিছু উত্থান-পতনের ভিতর দিয়েই তিনি সাকিব আল হাসান হয়েছেন। তবে প্রতিবার-ই পতনের পর উত্থানের গল্পটা তিনি রাজার মতোই লিখেছেন এবং তাইতো বাংলা ক্রিকেটের অবিসংবাদিত রাজা হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছেন। ২০০৬ সালে শুরু করা ক্যারিয়্যারে বেশিরভাগ সময় গাছের মগডালেই কাটিয়েছেন নিজের অতিমানবীয় নৈপূণ্য দিয়ে। তবে সফলতার মাঝেও বারবার নিজ ভুলেই বলি বা ন্যায়ের পথে অটল থাকতে যেয়ে চোখের বালিও হয়েছেন অনেক কর্তা ব্যাক্তিদের। যার ফলস্বরুপ রাজা কে বেশ কয়েকবারই নির্বাসনে কাটাতে হয়েছে। তবে প্রতিটা প্রত্যাবর্তন হয়েছিল রাজসিক প্রত্যাবর্তন, যেন কোটি জনতা পথপানে চেয়ে আছে তাদের সুলতান আসবে তাদের দুঃখ ঘোচাবে এবং সাকিব প্রতিবার-ই নবাবের মতোই এসেছিলেন এবং হাসি ফুটিয়েছেন টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত ৬৪ জেলার সব বাঙালিকেই।

আসুন প্রথমে জেনে নেই বিভিন্ন সময় সাকিব এর ক্রিকেটিয় জীবনে ঘটে যাওয়া বিচ্ছিন ঘটনা সমূহঃ
মাঠে ও মাঠের বাইরে বিভিন্ন কার্যকলাপের কারণে সাকিব আল হাসান বিভিন্ন সময় সমলোচিত হয়েছেন। ২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার সিরিজের ২য় ওডিআই চলাকালীন ড্রেসিংরুমে অশালীন অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করায়, তিন ম্যাচ নিষিদ্ধ ও তিন লাখ টাকা জরিমানা গুণতে হয় তাকে। এবং তার পরবর্তী ম্যাচে নেমেই সাকিব দারুণ এক অলরাউন্ডার নৈপুন্য প্রদর্শন করে মুখ বন্ধ করে দেন সকল সমালোচকের।

২০১৪ সালের জুলাইয়ে তাকে জাতীয় দল থেকে ৬ মাসের জন্য ও বাংলাদেশের বাইরের ক্লাব ক্রিকেটের জন্য ২০১৫ সালের জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড তাকে নিষিদ্ধ করে। জাতীয় দলের কোচ চণ্ডিকা হাথুরুসিংহার সাথে দুর্ব্যবহার, মাঠে অশোভন আচরণসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাকে এই শাস্তি দেয়া হয়েছে বলে বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান দাবি করেন। যদিও এই শাস্তি দেয়ার জন্য বোর্ডকে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়।

পরবর্তীতে ২৬ আগস্ট বিসিবির বোর্ড সভায় সাকিবের ইতিবাচক আচরণের কথা বিবেচনা করে, নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ কমানো হয়। সভায় সিদ্ধান্ত অনুসারে সাকিব একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে পারবেন। সাময়িক নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে বাংলাদেশ বনাম জিম্বাবুয়ে টেস্ট সিরিজে রাজকীয় প্রত্যাবর্তন করেন এবং প্রথম টেস্টে ৫৯ রানের বিনিময়ে প্রতিপক্ষের প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নেন। সর্বশেষ ২০১৯ বিশ্বকাপ শুরুর আগেও সাকিবকে নিয়ে শুরু হয় প্রচুর সমালোচনা।

দলের সাথে ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগ না দিয়ে আইপিএল-এ নিজ দলের সাথে ব্যক্তিগত ট্রেইনার এর সাথে অনুশীলন করেন। ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে উড্ডীয়মান বিমানে উঠার আগেও টিম ফটো তে না থেকে সমালোচনার সম্মুখীন হোন। সারাদেশ যখন সাকিবের নিন্দায় ফেটে পড়বে পড়বে অবস্থা ঠিক তখনই আবারো রাজা ফিরলেন রাজার বেশে।
প্রথম ম্যাচেই সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে ব্যাটে বলে দুর্দান্ত খেলে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ শুভ সূচনা করে এবং তারই ধারাবাহিকতায় পুরো বিশ্বকাপেই সাকিব লিখতে থাকেন মহাকাব্য। ব্যাট হাতে ট্যুরনামেন্ট এর ৩য় সর্বোচ্চ ৬০৬ রান করেন এবং বল হাতে নেন ১১ টি উইকেট। অনেক বড় বড় ক্রিকেট মহারথীর রেকর্ড এ ভাগ বসান এবং কিছু ভেঙেও দেন এই সাকিব ২০১৯ বিশ্বকাপে চোখের পলকে সারাদেশ এর পাশাপাশি সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালির মনে আসন পেতে বসেন সাকিব আল হাসান নামক বিস্ময়কর এই মানুষটি। তারপর আবারো দেশের ক্রিকেটে বড় রকমের এক ঝড় আসে।

[দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন]