ফুটবল, আবেগ কিংবা ভালবাসা

0
52

খান মোহাম্মদ রায়হানঃ কত পাগলামি, কত আবেগ,কত ভালোবাসা মিশে আছে এই হলুদ জার্সিটাতে!.

আচ্ছা ব্রাজিল নাম শুনলেই অন্য রকম একটা ফিলিংস কাজ করে। বা কেন এমন হয়?
হাজার মাইল দূরের ওই দলটার জন্য আমাদের কেনো এমন হবে?
এর উত্তর একেকজনের কাছে একেক রকম হতে পারে। সর্বসাকুল্যে বললে ব্রাজিল এমন একটা দল যেখানে ভালবাসা তৈরি হয়।
একজন আরেকজনকে ভালবাসতে শিখে।
তেমনি আমরাও এক ব্রাজিল ফ্যান আরেক ব্রাজিল ফ্যানকে ভালবাসি

এবার আসি মূল কথায়!
সময়টা ২০০৪ সাল। তখন আমি বেশ ছোট। প্রাইমারি স্কুলে পা রেখেছি কিনা মনে নেই। তবে মনে হয় রেখেছি। ফুটবল তখনো ভালমতো বুঝে উঠিনি।
খেলার নিয়মনীতি বুঝতাম না। তবে এটা ঠিক বুঝেছি। আমার বাবা হলুদ জার্সি পড়া একটা দলের সমর্থক।

বছর যায়। আমি আরো বড় হই।
বছর বেড়ে ২০০৬। সামনে তখন জার্মানি বিশ্বকাপ। এবার ফুটবল মোটামুটিরকম বুঝে উঠেছি। বল ঠেলবে জালে। জালে ঢুকলে গোল। আর যারাই বেশি গোল করে শেষমেশ তারাই জেতে।

২০০৬ বিশ্বকাপ দেখছি সাদা কালো টিভিতে। বাবা ব্রাজিল ভক্ত। ঘরে টিভি ছিলনা। তাই চেষ্টা করতাম অন্য ঘরে গিয়ে দেখার জন্য।

প্রথম বিশ্বকাপের আমার প্রথম প্রেমের সূত্রপাত হয়। ভালো লেগে যায় এক কালো ফুটবলারকে। তিনি রোনালদিনহো।
সবাই অবশ্য তার নাম নিতো। ঘটা করে বলাবলি করতো লিমা আর দিনহোর কথা। আশা ছিল সেবার বিশ্বকাপটা ঘরেই তুলবো। বিশ্বকাপে স্মরণীয় হবে আমার প্রথম ফুটবলের বছর। কিন্তু হয়নি।অথচ ওই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কাকা, দিনহো, লুসিও, রোনালদো লিমা, কার্লোস, কাফু, কি অসাধারণ দলটাই না ছিল কিন্তু এক জিদানের কাছে হেরে গেল তারকা ঠাসা ব্রাজিল।

২০০৯ সালে কনফেডারেশন কাপ দেখছিলাম। ফেভারিট হয়েও ফাইনালে ব্রাজিলের হারতে যাওয়া
গায়ে স্তব্ধতার জন্ম দিয়ে গেছিল। কিন্তু শেষতক হারিনি। প্রথম দুই গোল হজম করে ফ্যাবিয়ানোর অসাধারণ হ্যাট্রিক যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে দেয় চোখের পলকে। তাই আফ্রিকা বিশ্বকাপে প্রত্যাশাটা আকাশ ছুঁইছুঁই ছিল।

২০১০ সালে আমি আরেকটু বড় হই। এলাকায় মিশতে শুরু করি। বন্ধু জুটিয়ে ফেলি। সেবার নিজের জমানো ৫০ টাকা দিয়ে আরো কয়েজজন মিলে অনেক বড় পতাকা একটা পতাকা আমাদের টাঙিয়ে দেই আমাদের পাড়ায়।
কিন্ত প্রথমত এগিয়ে গিয়েও দুঙ্গার পাগলামি আর ফিলিপ মেলোর ভুল ব্রাজিলকে ঘরে ঠেলে দেয় জেতা ম্যাচ থেকে। তার পরের দুইদিন এলকার মধ্যে প্রচন্ড পরিমানে শিকার হয়েছে।
ঘুমোতে গেলে, খেতে বসলে, কাজে বসলে মন ডুবে যেত চিন্তারাজ্যে। কল্পনায় এসে দাঁড়াতো সেই ট্রাজেডি। আরিয়ান রোবেনের কর্নার থেকে ভেসে আসা বলটা ৬৭ মিনিটের গোল করে সমস্ত ব্রাজিল ফ্যানদের স্বপ্ন ভঙ্গ করে দেয় স্নাইডার।

সেই শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই দুবছর পর আবারো হোঁচট।
২০১২ কোপায় প্যারাগুয়ের সাথে পেলান্টি শ্যুট আউটে লজ্জার হার আফ্রিকা বিশ্বকাপের শোক বাড়িয়েছে বহুগুণ।

২০১৩’র কনফেডারেশনস কাপের সবগুলো ম্যাচ দেখেছি। জাপানের সাথে নেইমারের ডি বক্সের বাহির থেকে অসাধারণ ঝলক, মেক্সিকোর সাথে সেম অসাধারণ গোল এরপরে ইতালি বধ।
আর খুশির পাখনায় শেষ পালক গজিয়েছে স্পেনকে নিয়ে এক প্রকার ছেলেখেলা করা ফাইনালটা দেখে।
সদ্য বিশ্বকাপজয়ী দল। বাঘাবাঘা সব তারকা। নন্দিত সব ফুটবলার। অথচ তারাই ধরাশায়ী একটা নবীন দলের কাছে।
শেষ পর্যন্ত স্পেনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে হ্যাটট্রিক কনফেডারেশন কাপ চ্যাম্পিয়নের গৌরব অর্জন করে।

২০১৪ সাল। বলতেই আজো বুক ধড়ফড় করে উঠে। ঘরের মাঠ। ঘরের স্টেডিয়াম। ধীরেধীরে প্রস্তুত হওয়া ফাইনালের মঞ্চ। অথচ সবটাই বানের জলে ভেসে গেছে বেলা হরিজন্তের ট্রাজেডিতে।
সেদিন রাতে কান্নার জন্যে ঘুমাতে পারিনা। শেষ ৩ দিন ধরে নিজের অবস্থা কেমন হয়েছিল যা কখনোই বলে বোঝানো সম্ভব না। এলাকার মধ্যে অসম্ভব ট্রলের স্বীকার হয়েছি, তারপরও এক বিন্দু পরিমান অন্তর থেকে ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসা কমে না বরং আরো বেড়ে গেছে।

২০১৬ সালে এসে সেই প্যারাগুয়ের সাথে আবারো পেনাল্টি শুটআউটে হার। একি ট্রাজেডি বারবার একি রঙে।
কিন্ত সেই একই বছর স্বস্তির খবর ব্রাজিল প্রথমবারের মতো নেইমারের হাত ধরে জার্মানিকে পেলান্টি শুটআউটে পরাজিত করে অলিম্পিকের সোনা জয়।

২০১৮ সাম্প্রতিক পারফরমেন্স ও স্কোয়াড ডেপথ বিবেচনায় ব্রাজিলকে অন্যতম ফেবারিট বলছেন ফুটবল বোদ্ধারা। বিশ্বের তাবৎ ব্রাজিল সমর্থকের মতো আমিও বিভোর হয়ে আছি হেক্সার স্বপ্নে।
এই টিমটা আসলেই আশাবাদী হবার মতো। দলটিকে একসুতোয় নিবিড়ভাবে গেঁথেছেন কোচ তিতে। দলের প্রাণভোমরা যদিও নেইমার। তবুও দলটি শুধু নেইমার নির্ভর নয়।
ইনজুরি আক্রান্ত নেইমার। তার উপর দলে নেই অভিজ্ঞ আলভেজ। তারপরও বেলজিয়ামের সাথে দাপুটে রকম লড়াই করেছে ব্রাজিল। সাজিয়েছে অসংখ্য আক্রমণের হিড়িক। কিন্তু ক্যাসেমিরোর সাসপেনশনের জন্য নামতে না পারাই ছিল ম্যাচের পার্থক্য। সাথে বেলজিয়াম কিপার কর্তুয়ার নেইমারের করা ৯৩ মিনিটের সট টি পরীর মত লাফ দিয়ে অসাধারণ সেভটি দেখে ওই সময় মনে হচ্ছে কলিজার মধ্যে কে জানি আঘাত করছে।

পুরনো কষ্ট এবং স্মৃতি ভুলে আশা করি ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের নেইমার, এলিসন, ক্যাসেমেরো, আর্থুররা নক্ষত্র হয়ে আলো ছড়িয়ে আমাদেরকে বিশ্বকাপ উপহার দিবে আর সেদিন টা বেশি অপেক্ষার নয় অতি কাছে।

ট্রাজেডি ছিল। মনভাঙা সময় ছিল। কষ্টের রাত ছিল আর সাথে ছিল জেতার বাঁধভাঙা উল্লাস। জিতবার অবর্ণনীয় খুশি। এটাই আমার জীবন। এটাই আমার যৌবন। ব্রাজিলের হলুদ রঙে সেই মিশে থাকার ১৪ বছরে পা দিয়েছি এখন। কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছে ভালবাসাটা আজো নতুন। আজো অন্যরকম মন ভালো করার মোড়কে মোড়া।
ব্রাজিল একটি ভালোবাসা, আবেগ এবং মহামূল্যবান ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া একটি অনুভূতির নাম।
হৃদয়ের প্রতিটি ধ্বনি, প্রতিধ্বনিতে যে তরঙ্গ বয়ে বেড়ায় সেই নামের প্রতিশব্দ ব্রাজিল।
ব্রাজিল মানে ভালোবাসা, ব্রাজিল মানে হাজারো নিদ্রাহীন রাতের অনুভূতি নিয়ে খেলা দেখা।
ব্রাজিল মানে জয়োল্লাস করা।
ব্রাজিল মানে হেরে গিয়েও নিদ্রাহীন রাত জাগা।

অতিথি লেখকঃ খান মোহাম্মদ রায়হান