পেরেজের চোখে রিয়াল মাদ্রিদের বর্তমান ও ভবিষ্যত

0
512

সাম্প্রতিক স্প্যানিশ রেডিওকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মাদ্রিদ প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ রোনালদোর মাদ্রিদ ছাড়ার কারণ, জিদানের প্রস্থান ও পুনরায় নিয়োগ, ১৮/১৯ মৌসুমে মাদ্রিদে অবস্থা ও পরবর্তী সিজনে মাদ্রিদের পরিকল্পনা এবং সমসাময়িক বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা ও বর্ণনা করেন।

রোনালদো চলে যাওয়া সম্পর্কে পেরেজ বলেন-
“ক্রিস্টিয়ানো একটা পরিবর্তন চেয়েছিলো। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল এর সুযোগ নিয়ে সেটা এটি আমাদের জানায়। আমার সাক্ষরকৃত প্লেয়ারদের মাঝে সে সবার সেরা। আমাদের সাথে তার নয় বছর ছিল অসাধারণ। সে কখনোই কোন সমস্যা সৃষ্টি করেনি। আমার সাথে ব্যাক্তিগত ভাবেও তার কোন সমস্যা হয়নি, এমনকি টাকা নিয়েও না। তার সাথে আমার সম্পর্ক ছিল সবসময় অনেক ভালো। মিডিয়াতে যা কিছু বলা হয়েছে তার কিছুই সত্য না। রোনালদো কখনো তার ট্যাক্স পরিশোধ করতে মাদ্রিদকে বলেনি। সে শুধু একটা পরবির্তন চেয়েছিল। নতুন জায়গা চেয়েছিল।
আসলে তার মত সেরা খেলোয়াড়রা মাঝেমধ্যে পরিবর্তন আনতে চায় জীবনে। সে পরিবর্তন হিসাবে জুভেন্টাসকে পছন্দ করে। সে যদি সেখানে খুশি থাকে তাহলে আমরা সবাই খুশি। আমরা ভেবেছিলাম বেল, এসেন্সিও, ভিনিসিয়াস দিয়ে তার শূন্যতা পূরণ করতে পারবো।”

রোনালদো যাওয়ার পর তার সাথে আমার কথা হয়েছে কিনা?
“এগুলা কিছু জিনিস আমি শেয়ার করতে চাই না।”

রোনালদো চলে যাওয়া মাদ্রিদের বর্তমান সমস্যার কারণ?
“আমার মনে হয় না মাদ্রিদের বর্তমান সমস্যা রোনালদোর সঠিক রিপ্লেসমেন্ট এর জন্য হয়েছে।
জিদান আমাদের ছেড়ে গেয়েছিলো কারণ সে ক্লান্ত ছিল। এই সিজনে বাকী সব প্লেয়ারের ক্ষেত্রেও এটা ঘটেছে শুধু বেনজেমা ছাড়া।”

জিদানের চলে যাওয়া প্রসঙ্গে-
“আমার জন্য চ্যাম্পিয়ন্স লিগ হলো সকল কম্পিটিশনের রাজা। জিদান সেখানে টানা তিনবার সফল হয়ে খুব চাপ অনূভব অনুভব করেছেন। আমরা দেখেছি খেলোয়াড়রা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সাথে তাদের ট্রেইনার ও। তাই জিদান সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্রাম নেয়ার। সে আমাকে কল দেয় এবং বলে সে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। আর যখন জিদান কোন সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় তখন সেটা পরিবর্তন করা সত্যি খুব কঠিন। আমি তাকে প্রথম যখন খেলোয়াড় হিসাবে দলে আনি তখন থেকেই সে এমন। ব্যাক্তিগত কোন সমস্যা না। সে যাওয়ার জন্য এত উদ্বিগ্ন ছিল শুধু মাত্র সে ক্লান্ত ছিল বলে। তার-আমার সম্পর্ক ভালো আছে, ভালো ছিল।”

লোপেতেগুই নিয়োগ সম্পর্কে-
“জিদান যাওয়ার পর লোপেতেগুই ছিল আমাদের প্রথম চয়েজ। তখন তেমন ফ্রি কোচ ছিলো না। ক্লপের পাঁচ বছরের কন্ট্রাক্ট ছিল। আরো অন্যান্য কোচদেরও দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তি ছিল লোপেতেগুই ছাড়া।”

“এর আগেও অনেকবার জাতীয় দল থেকে ক্লাবে কোচ সাইন হয়েছে। কোন সমস্যা হয়নি। এখানে কি হয়েছে আমি এখনো বুজি না। আমরা লোপের জন্য স্প্যানিশ ফুটবল এসোসিয়েশন কে কোন টাকা দিই নি। কারণ তারা আগে তাকে বরখাস্ত করেছে।”

কিছু সময় পর আমরা উপলব্ধি করলাম যে কোচ পরিবর্তনের মাধ্যমে আমাদের সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। আমরা টানা কয়েকটা ম্যাচ হেরে যাই। সেই সময় এটা বুঝা খুবই কঠিন ছিল যে এই দলটা আমাদের প্রত্যাশার মত ফল দিতে পারবেনা। দলের উপর অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপই তাদের সাধারণ খেলাতে ব্যাঘাত ঘটায়। ”

“ডি-স্টেফানোর যুগ ছাড়া আমরা গত ছয় বছরের মত অর্জন আর কখনো পাই নাই। আমরা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ধারুন ভাবে সফল হয়ে যাচ্ছিলাম এবং দলের উপর প্রতি বছরই এর চাপ বাড়তে ছিল। লোপেতেগুই যথেষ্ট চেষ্টা করছে। কিন্তু সমস্যা কোচের মধ্যে ছিল না। সমস্যা ছিল প্লেয়ারদের ক্লান্তকর মনোভাব। তাদের অনেকেরই লম্বা ছুটি প্রয়োজন ছিল। শারীরিক এবং মানুষিক উভয় ভাবেই তারা প্রচুর ক্লান্ত ছিল। ”

বর্তমান স্কোয়াডকে ডিফেন্ড করে পেরেজ বলেন-
“ফুটবল আসলে কিছু সময় অযৌক্তিক। আপনি সবসময় জিততে চাইবেন। আমাদের খেলোয়াড়দের মাঝে কয়েকজন মাঠে অপমানিত হয়েছে। অথচ এরাই আমাদের জন্য হিস্টোরি সৃষ্টি করেছে, আমাদের ইতিহাস বয়ে নিয়ে যাচ্ছে।”

“আমরা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়কে একদম সাধারণ একটা ঘটনা করে ফেলেছিলাম। কিন্তু আসলেই কি এটা এতই সহজ? লিভারপুলের বিপক্ষে বার্সার হারে আমি খুশি হইনি। কিন্তু এটা প্রমাণ করে যে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ কতটা কঠিন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।”

“কিন্তু আমাদের প্লেয়ারদের অনেক অপমান সহ্য করতে হয়েছে। এমনকি সাংবাদিকরাও তাদের অপমান করেছে। এটা ঠিক না। খেলোয়াড়রাও মানুষ। গত ১০ বছরে এই দলটা ১৭ টা টাইটেল।জিতেছে। পাঁচবছরে চারটা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছে। এমনকি এই সিজন অবধি ১৫০০ দিন এর বেশি ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন্স ছিল টানা। এগুলো আপনাদের ভুলে গেলে চলবে না।”

নতুন সিজনে দল গঠন সম্পর্কে-
“আমার একটা আশা আছে হ্যাজার্ডকে দলে ভিড়ানোর এই সিজনে। পরবর্তি সিজনে একটা ভালো দল আশা করি আমরা।”
“আমরা কখনো এম্বাপ্পের সাথে কথা বলি নি আর কখনো বলবোও না। কোন প্লেয়ারের প্রতি আমাদের আগ্রহ থাকলে আমরা সেই প্লেয়ারের ক্লাবের সাথে আগে কথা বলবো। আমরা প্রতিটি খেলোয়াড় এবং ক্লাবকে সম্মান করি।”

পেরেজ দল গঠনে তরুণ প্রতিভাবানদের নিয়ে কাজ করার কথাও ব্যাক্ত করেছেন। সে বলেন-
“কার্ভাহাল এখানে এসেছে ১০ বছর বয়সে। মার্সেলো এবং ভারানে ১৮ বছর বয়সে। রামোস ১৯ বছর বয়সে। এরা এখন আমাদের স্টার্টিং ডিফেন্ডার যাদের তিনজনই ফিফা বর্ষ সেরা একাদশে ছিল কয়েকবার। তারা অনেকটা শিশু হিসাবেই এসেছিল। এখনও আমদের তরুণদের নিয়ে কাজ করতে হবে এবং সেটাই আমরা করছি। আমরা একটা ভালো দল তৈরী করবো।”

“ওডেগার্ড ১৬ বছর বয়সে এখানে আসে। এখন তার ২০ বছর। আগামী ২/১ বছরের মধ্যে সে হবে মাদ্রিদের অন্যতম তারকা। এছাড়া আমাদের আছে রদ্রিগো, ভিনিসিয়াস, ব্রাহিম এর মত সেরা তরুন সব প্লেয়ার। এরাই পরবর্তিতে আমাদের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এনে দিবে।”

লুকা এবং নাভাস প্রসঙ্গে –
“ক্লাবে কেউই বলেনি যে লুকা দ্বিতীয় গোলরক্ষক হতে যাচ্ছে। তারা (মিডিয়া) জিদানকে এবং ক্লাবকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য জিদানের পুত্রকে ব্যবহার করছে। এটা খুবই কুৎসিত ঘটনা।”
“নাভাস কেন আমি ‘গুডবায়’ বলতে যাবো? তার সাথে আমাদের চুক্তি আছে এখনো।”

মাদ্রিদের সাথে আপনি আর কতদিন আছেন?
“জীবন আপনাকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন অভিজ্ঞতা দেয়। তবে ফুটবল আমাকে আনন্দ ছাড়া আর কিছুই দেয়নি। আমি ৫ টা ইউরোপিয়ান কাপ জিতেছি কিন্তু আমি সেটা নিয়ে শো-অফ করতে চাই না। আমি নিজেকে মাদ্রিদের প্রতি উৎসর্গ করে দিয়েছি। আমার খুব ভালো অনুভব হয় যে মাদ্রিদের মালিক তার মেম্বারদের, কোন একক ধনী এর মালিক নয়।”

“আমি মাদ্রিদ ছাড়ার ব্যাপারে এখনো কিছু ভাবি নাই। যদি আমি যাই, আমি অবশ্যই তখনই যাবো যখন সবকিছু ঠিকঠাক চলবে। আমরা বর্তমান পরিস্থিতির অবশান ঘটাবো।”