পছন্দ থেকে বিতর্ক!

0
71

আরফিন শিশির: একটা কল্পনার হোমওয়ার্ক দিচ্ছি,

ধরুন কাজ সেরে স্নানে গেলেন। আসলেন একঘণ্টা পর। গায়ে শক্তি নেই। শরীর ক্লান্ত। বড্ড খিদে পাচ্ছে। এসেই বসলেন ডাইনিংয়ে। প্লেট উল্টালেন। উল্টিয়েই জানলেন আজকের মেন্যুতে আপনার পছন্দের ডিশ ‘ভুনা বীফ’।
উফ! একদম জমে ক্ষীর। তাইনা?

জিব লকলক করছে। পেট খাইখাই করছে। অপেক্ষা আর সওয়া যাচ্ছেনা। হাত ধুলেন। ভাত নিলেন। মাংসের দিকে হাত বাড়াবেন আর এমন সময় আপনার বড়’দা ভাই এসে হাজির।

তার বীফে ঘোরতর অরুচি। তাই আপনারও বীফ খাওয়া বারণ। আপনার গায়ে এলার্জি নেই। চুলকুনি নেই। ডাক্তার নিষেধও করেনি। তবুও বারণ।

কারণ, দাদার চয়েস চিকেনে। তাই ওটা আপনাকেও খেতে হবে। না চাইলেও খেতে হবে। না চাইতেই খেতে হবে।

কি একটা ব্যাপার না?
আপনার কোন চাওয়া নেই। কোন নিজস্বতা নেই। কোন পছন্দ অপছন্দের ফ্রিডম নেই। দাদার পছন্দই আপনার পছন্দ। চাইলেও। না চাইলেও।

এই বিষয়টা একটা কাল্পনিক অনুগল্প। তবে বর্তমান ঘরনার স্পোর্টস কমিউনিটিতে এটা দারুণ চলে। চলে কেন? স্রেফ এটাই চলে। যুগ বলছে এক কথা। যুগ চাইছে একটা। আপনি চাইছেন আরেকটা। উঁহু! হবেনা।

সবাই যা চাই। আপনাকেও তা চাইতে হবে। সবাই যা খাই আপনাকেও তাই খেতে হবে। এর বাইরে গেলে বিপদ। এর বাইরে বেরুলেই অসামাজিক ট্যাগ।

আপনার পছন্দের কোন ভেল্যু নেই।
আপনার ইচ্ছের কোন সম্মান নেই।
আপনার চাওয়ার কোন গুরুত্ব নেই।
সবাই যা চাচ্ছে। মুখ আটকাতে আপনাকেও তাই চাইতে হবে। তাই বলতে হবে।

প্রসঙ্গত কদিন আগে এক গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাতকারে বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিলীয় ফুটবলার রোনালদো লিমা এক অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন। তার পছন্দের কথা জানিয়েছেন।

প্রশ্ন ছিল তার প্রিয় পাঁচ ফুটবলারের লিস্টে কে কে আছেন?
তিনি উত্তর দিলেন। মেসিকে বরাবরের মতো রাখলেন লিস্টের টপে। নেইমারকে রাখলেন। সালাহ, হ্যাজার্ড, এম্বাপ্পেকেও রাখলেন।

তবে সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার তার তালিকায় সময়ের সবচে কমপ্লিট ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর নাম অনুপস্থিত।

অবিচার না? শেষ দশ বছর তো আছেই। আরো পাঁচ বাড়িয়ে দিলাম। মোট পনেরো। এই পনেরো-ষোলো বছর ফুটবলের রাজত্বকে চাবুক পিটিয়ে শাসন করা দুজনের একজন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

মেসিই তার সম যোগ্যতার। কোন কোন দিকে আবার তাও না। ফুটবলীয় এচিভমেন্ট, ব্যক্তিগত এচিভমেন্ট, দলগত অর্জন অথবা পছন্দের সব খুঁটিনাটি। এই সবকিছুই ধসে যায় একটা নামের ওজনে। ওটা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

তাই রোনালদোর ভক্ত সমাজ তো আছেই। সাথে ফুটবলের নিয়মিত খোঁজখবর রাখা প্রতিটা ভক্তের কাছেই ব্যাপারটা বেশ বেখাপ্পা।

হওয়াটাই স্বাভাবিক। যেখানে কদিন আগে উঠে আসা সেনসেশন কিলিয়ান এম্বাপ্পেকে দেখা যায়। যে তালিকায় ছ’বছর আগেও নামগন্ধ খুঁজে না পাওয়া মোহাম্মদ সালাহ জায়গা পেয়েছেন সেখানে ক্রিশ্চিয়ানোর থাকাটা এক প্রকার ওয়াজিব ছিল। কিন্তু তাঁকে তালিকাতেই রাখেননি রোনালদো লিমা।

এরপর তর্কবিতর্কের শুরু। পরিসংখ্যান ঘাটাঘাটি শুরু। লিমার সাথে রোনালদোর তুলনা শুরু। আর সবচেয়ে শেষ ধাপে এসে শুরু ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ভক্তগোষ্ঠী বনাম ব্রাজিল ফ্যানবেজের তর্কাতর্কি।

বিষয়টা আদতেই খামাখা যুদ্ধ।
যার কোন যুক্তি নেই। ভিত্তি নেই। ফলাফলও শূন্য। কিন্তু তবুও রেষারেষি চলছে। কন্ট্রোভার্সি নিচ্ছে নতুন নতুন মোড়।

একটা লোকের ব্যক্তিগত পছন্দ থাকতেই পারে। তার ভিন্ন মত, ভিন্ন ভাবনা ভাবার অধিকার পুরোপুরি আছে। এটা তার নিজস্ব ব্যাপার। নিজস্ব চিন্তা। একেবারে নিজের কথা। এতে হস্তক্ষেপ করে তিল থেকে তাল খুঁজতে যাওয়া শুধু সময় অপচয়ই নয় বলা যায় এক প্রকার বোকামি।

চয়েসে ভিন্নতা থাকবে। রুচিতে পার্থক্য থাকবে। বাছাইয়ে ভিন্নতা থাকা স্বাধীনতা থাকা একটা সৌন্দর্য, একটা নিজস্বতা।

সবাই বলছে ব্রাজিলের কথা। কিন্তু আপনার ধীরগতির ম্যাজিক পছন্দ না। আপনি বারুদ গতি পছন্দ করেন। আচমকা শট দেখতে চান। প্রিমিয়ার লিগের কাউন্টার ভালবাসেন। অবশ্যই পারেন। এটা আপনার ব্যাপার। আপনার মনের আলু পরোটা।

সবাই জার্মানিকে চায়। বিদ্যুৎগতিতে জাল ফাটানো দেখতে চায়। কিন্তু আপনি রক ফুটবলে আসক্ত নন। আপনার ভয়ংকর ড্রিবলিং ভালো লাগে। মাথার উপরে তুলে দেয়া রেইনবো ফ্লিক দেখতে মন চায়। পারবেন। আপনার পছন্দ, আপনার রুচি।

এ নিয়ে বিতর্ক করা অনুচিত। কিন্তু বিতর্কটা এসেছে। এসেছে এই কন্ট্রোভার্সিয়াল টপিকে নয়। এর আরো পিছের ছোটবড় অসংখ্য ঘটনার যোগ বিয়োগে।

ফিফার পেইজে লিমা বনাম রোনালদো ভোটিং পোল। নেইমার বনাম সাবেক জুভেন্টাস ফুটবলার এমেরি চেনের সংঘর্ষ। রোনালদোর সাথে নেইমারের তুলনা। সর্বোপরি পর্তুগাল আর ব্রাজিলের কম্পেয়ার। এই সব পূর্বঘটনার জের ধরে আজ অনেকদিন যাবৎ ব্রাজিল বনাম পর্তুগাল একটা বক্সিং ফাইট দাঁড়িয়ে গেছে ফ্যান ফলোয়ারদের মাঝে।

কেউ কাউকে ছাড়েনা। কেউ ছাড় দিতে নারাজ। কেউ ইউরোপের পাওয়ার শক্তি দিয়ে লাতিন ওল্ড টেকটিক্স মাপতে চায়। কেউ সাউথ আমেরিকান দেখার সৌন্দর্য চোখের আরামের ফুটবল দিয়ে ইউরোপের যান্ত্রিক ফুটবলে টিপ্পনী কাটে।

কারো চোখে ব্রাজিলের অর্জনে পর্তুগাল তুচ্ছ। আর কারো দৃষ্টিতে রোনালদোর অর্জনে লিমা, নেইমার নস্যি। তাই কোন পক্ষের পান থেকে চুন খসলেই যুদ্ধের দামামা জোরেশোরে বেজে উঠে।

অথচ খেয়াল দিলে দেখা যায় এই পছন্দ অপছন্দটা রোনালদো ফেনোমেনেনের একটা নিজস্ব মতামত। তার ব্যক্তিগত চয়েস।
এর আগেও এরকম অসংখ্য মুহূর্ত ফুটবল জগতে গা ভাসিয়েছে। নতুন কন্ট্রোভার্সির জন্ম দিয়েছে।

কেউ কেউ ওয়েইন রুনিকে সাদা পেলে বলে আলোচনা বাড়িয়েছিলেন। কেউ কেউ পেলে নাকি ম্যারাদোনা এই বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছেন মেসিকে দিয়ে। কারো চোখে মালদিনি অদ্বিতীয় আর কারো কাছে বেকেনবাওয়ার এক পিচ।

এসব স্রেফ নিজস্ব চিন্তা। নিজস্ব ভাবনা। একান্তই নিজের কথা। এগুলো কোন উক্তিই কোন ফুটবলারের মহাতারকা হবার সার্টিফিকেট নয়। কোন পছন্দ অপছন্দ কারো নামের পাশে ব্যালন ডি’অরের খেতাব আনেনা। কারো সুপারিশে আজ কেউ সেরা ফুটবলার বিবেচিত হয়েছে এমন নজির ফুটবলের ইতিহাসে অন্তত নেই।

রোনালদো লিমা পছন্দ করুক আর না করুক। ফুটবলের শুধু এই প্রজন্ম কেন, পূর্বসূরিদেরও অনেকেই মানেন ফুটবলের মেধা আর গুণাগুণ বিচারে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোই ইতিহাসের সবচেয়ে পরিপূর্ণ একজন। প্রিমিয়ার লিগের ধ্রুপদী লড়াই, প্রিমেরা লিগের নিয়ন্ত্রণ করে খেলা কৌশল অথবা ইতালিয়ান ওল্ড স্কুলের জমাটবদ্ধ ডিফেন্সে তালা খোলার লড়াই। কোনটাই ক্রিশ্চয়ানো রোনালদোকে সেরা হবার দৌড়ে আটকাতে পারেনি।

রোনালদো ক্লাবের জার্সিতে সেরাটা জিতেছেন। ভিন্ন ভিন্ন ক্লাবে যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। আর সবচেয়ে বড় কথা ক্লাব ছাড়িয়ে জাতীয় জার্সিতেও তিনি সফলতার কাণ্ডারি। সফল হবার যোগ্য উদাহরণ।
তাই রোনালদো লিমার তালিকায় ক্রিশ্চিয়ানো না থাকলেও। শ্রেষ্ঠত্বের তালিকায় তার দৌড় কোন অংশে পিছিয়ে নেই। কোন অংশে কম নেই।

তাই এই কন্ট্রোভার্সি একটা সময় ক্ষেপণ ছাড়া কিছুই নয়।
কারো চয়েসে যেমন কেউ সেরা বলে পার পায়নি। তেমনি কারো চয়েসে হাত দেবার কথাও মূল্যহীন, ভিত্তিহীন।

তাই বিতর্ককে ঠেলে ফেলে ফুটবলের সবুজ শামিয়ানায় সৌহার্দের মশাল নিয়ে দাঁড়ানোই বুদ্ধিমানের বিচার। বুদ্ধিমানের পরিচায়ক।