দিনে ক্রিকেট খেলে সন্ধ্যায় বেঁচতেন পানিপুরি

0
56

ক্রিকেট খেলার জন্য মুম্বাইয়ের অনেক মাঠই এখন বিশ্ব পরিচিত। এই শিবাজী পার্কে কথাই ধরা যাক। যেখান থেকে খেলা শুরু করে ভারতীয় ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার হয়েছেন শচিন টেন্ডুলকার। শিবাজী পার্ক এর মতোই পরিচিত মুম্বাইয়ের আজাদ ময়দান মাঠটি। শচিন যে বছর ক্রিকেট থেকে অবসরে যান সে বছরেই এই মাঠে খেলতে আসেন ১১ বছর বয়সী এক কিশোর। নাম তার ইয়াশাভি জাসওয়াল। লক্ষ্য শচীনের মতো ক্রিকেটার হওয়ার। সে জন্য কঠোর থেকে কঠোর পরিশ্রম করা শুরু করলেন। ক্রিকেট ছাড়া মাথায় যেন আর কিছুই ছিল না কিশোরটির। তাই সারাদিন ক্রিকেট নিয়েই থাকতেন। তবে দিনভর ক্রিকেট খেললেও আয়ের কোনো উৎস ছিল না তার। তাই শুরু করলেন পানিপুরি বেচা। পুরো দিন ক্রিকেট খেলে আজাদ ময়দানে কাটিয়ে সন্ধ্যে হলেই বসে যেতেন পানিপুরি বেচার জন্য। তাও মাঠটির ঠিক পাশেই।

ছয়টা বছর এভাবেই চলল। কঠোর পরিসশ্রমের সুফলও পেলেন হাতেনাতে। প্রথমে ভারতের অ-১৯ দলে সুযোগ পাওয়ার পর ঘরোয়া ক্রিকেটে জায়গা করে নিয়েছেন মুম্বাইয়ের হয়ে। প্রথমবার লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে খেলতে নেমে মাত্র পঞ্চম ম্যাচেই ডাবল সেঞ্চুরি হাকিয়ে রীতিমত হইচই ফেলে দেন ভারতীয় ক্রিকেট পাড়ায়। বিজয় হাজারে ট্রফিতে ঝাড়খান্ডের বিরুদ্ধে সেই ম্যাচে ১৫৪ বলে ১৭ চার ও ১২ ছয়ের সাহায্যে ২০৩ রানের নান্দনিক এক ইনিংস উপহার দেন জাসওয়াল। হয়ে যান লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বকনিষ্ট ডাবল সেঞ্চুরিইয়ান।

জাসওয়াল ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এসেছেন। অ-১৯ দলে ১৩ টি ম্যাচে ৫৩.১৬ গড়ে করেছেন ৭২৭ রান। বিজয় হাজারে ট্রফিতেও প্রথমবার খেলতে নেমে শুরুটা করেছেন দুর্দান্ত। ডাবল সেঞ্চুরির হাকানোর আগে খেলা চারটি ম্যাচের দুটিতেই সেঞ্চুরি আছে তার।

ভারতীয় ক্রিকেটে বর্তমানে জনপ্রিয় মুখ এখন জাসওয়াল। যে অসামান্য কীর্তি তিনি করছেন তাতে নাম কুড়োচ্ছেন পত্রিকার শিরোনামগুলোতে। অথচ সাফল্যের এই পথে উঠে আসাটা সহজ ছিল না জাসওয়ালের জন্য।

উত্তর প্রদেশের ছোট্ট একটি শহরে জন্ম তার। খুব ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে আসেন মুম্বাই। প্রথমবার এসেই ভালোবেসে ফেলেন শহরটাকে শুধুমাত্র ক্রিকেটের জন্য। কেননা শচিনও যে এখান থেকে ক্রিকেট খেলা শুরু করেন। তাই বাবাকে গ্রামের পথে বিদায় করে এখানেই চাচার কাছে স্থায়ী ভাবে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

তবে চাচার ঘরটাও থাকার মতো অতো বড় ছিল না। তাই থাকতে লাগলেন তাবুতে। যেখানে তার সঙ্গী ছিল আজাদ ময়দানের মাঠকর্মীরা। একা থাকায় জাসওয়ালকে নিজের খাবার নিজেরই তৈরী করতে হতো। কিন্তু থাকা খাওয়ার জন্য পরিবার থেকে পর্যাপ্ত টাকা পয়সা পেতেন না তিনি। তাই চাচার সংগে মিলে পানিপুরি বেচা শুরু করলেন আজাদ ময়দানের পাশে। দিনের বেলা খেলার পর সন্ধ্যায় মাঠের পাশে জাসওয়ালকে পানিপুরী বেচতে দেখে অবাক হয়ে যেত তার বন্ধুরা। এমনকি মাঝেমধ্যে খোঁচাও মারত অনেকে এবং মুম্বাইয়ের হয়ে খেলার পরও কমেনি।

একদিন জাসওয়ালের জীবনে নেমে এলে জ্বলা সিং নামের একজন দেবতা। তার সম্পর্কে জাসওয়াল বলেন, “কেউ একজন আমার আর্থিক সমস্যার কথা তার কাছে বলে। স্কুল ক্রিকেটে তখন খুব ভালো খেলছিলাম আমি এবং একদি স্যার আমাকে তার বাসায় নিয়ে যান। তার কাহিনীটাও ঠিক আমার মতো। হাতে অল্প টাকা পয়সা নিয়েই মুম্বাই এসেছিলেন তিনি। কিন্তু সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য কারও সমর্থন পাননি তিনি। তাই ভাবলেন এই একই জিনিস যাতে আমার সাথে না ঘটে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, সামনে কি করতে চাই আমি এবং আমার বর্তমান অবস্থ কি। আমি তাকে সবকিছু খুলা বলার পর সে বলল, আচ্ছা বেটা এখন থেকে তুমি আমার বাসায় থাকবে এবং তোমার যা কিছু দরকার সব আমি করে দেব । সে আমার কাছে দেবতার মতো এবং সারাজীবন তাকে এভাবেই শ্রদ্ধা করে যাব। তার কারণেই আমি এখানে পৌঁছাতে পেরেছি। সামনে আগানোর জন্য আমাকে আরো অনেক পরিশ্রম করতে হবে।”

রেকর্ড ডাবল সেঞ্চুরি হাকানোর পর আকাশে উড়লেও পা টা মাটিতেই রাখছেন জাসওয়াল। তিনি মনে করেন, এটা সবে মাত্র শুরু। সামনে এগোতে হলে আরো পরিশ্রম করতে হবে তাকে। বাকিটা ইশ্বরের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। সামনে আইপিএলের নিলামে নাম উঠবে তার। যে ফর্মে আছেন তাতে হয়তো কোনো একটা দল পেয়েই যাবেন। তবে তার জীবনে সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হচ্ছে দেশের জার্সিতে খেলতে নামা। আপাতত এই লক্ষ্যেই এগোচ্ছেন তিনি। সেই স্বপ্ন পূরণ করে গর্বিত করতে চান বাবা-মাকে।