দারিদ্রতাকে অনুভব করা অনন্য রাশফোর্ড

0
27

মানুষ তার জীবনে যে কষ্টটা সহ্য করে আসে যে দুঃখটা মনের মধ্যে গেঁথে অনুভব করে আসে সেটি সবসময় মনের অজান্তে তাকে তাড়া করে বেড়ায়। যদি সে অহংকারী নাহয় সেই দাগ লাগা উপন্যাসের চিত্ররূপ কারো জীবনে ঘটুক নিশ্চয় এটা অন্তত চাইবেনা। আজ বলছি রাশফোর্ড, হ্যা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর সুপারস্টার বনে যাওয়া মার্কোস রাশফোর্ডের ছেলেবেলা এবং মানবিক রাশফোর্ড হয়ে ওঠার গল্প।

রাশফোর্ড যেদিন জন্মগ্রহণ করেছিল সেই দিনটা ছিলো ৩১ অক্টোবর ১৯৯৭। ভাগ্যক্রমে ওই দিনটা ছিলো হ্যালোউইন দিবস। তার পরিবার এবং আত্মীয় স্বজনরা মনে করেছিলো এই ছেলে নানা অঘটন ঘটাবে। জন্মানোর ২ বছরের মাথায় ফুটবলে কিক মারা ছেলেটা আজ একজন তারকা ফুটবলার। এটাই কি ছিলো অঘটন!! তাঁর বাবা রবার্ট রাশফোর্ড এবং মা মেলানিয়ার রাশফোর্ডের সংসারে চার সন্তানের মধ্যে তৃতীয় সন্তান হলো মার্কাস রাশফোর্ড। ওথেনসশো, ম্যানচেস্টারে বেড়ে উঠা রাশফোর্ডের খুব ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ। ফুটবলের প্রতি তার এই আগ্রহ তার মায়ের শাসনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাচ্চা ছেলেটি ফুটবল নিয়ে খেলা করতে গিয়ে ঘরের জিনিসপত্র প্রায়ই ভেঙে ফেলতো। এইজন্য তাকে প্রচুর ধমক খেতে হতো। ফলে ফুটবলের আশ্রয় হয় নিজের বাড়ির গ্যারেজের ছাদটি। আর সেখান থেকেই ফুটবল দক্ষতার বিচরণ শুরু। ফুটবলের প্রতি ছেলের আগ্রহের বিষয়টি বিবেচনা করে রাশফোর্ডের বাবা তাকে স্থানীয় ক্লাব ‘ফ্লেচার ম্যাস রেঞ্জার্স ‘ এ ভর্তি করিয়ে দেন। ফুটবলে প্রথম অনুপ্রেরণা দেন তার বাবা। মজার বিষয় হলো উক্ত একাডেমির কোচ ছিলেন উনি নিজেই।

রাশফোর্ডের বয়স যখন মাত্র ৪ বছর তখন ফ্লেচার ম্যাস রেঞ্জার্সে অনুশীলন শুরু করে। তার ফুটবলীয় দক্ষতা এতই চিত্তাকর্ষক ছিল যে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড একাডেমি কর্তৃক ট্যালেন্ট স্কাউটে সে জায়গা করে নেয়। এখান থেকেই তার পথচলা শুরু। মাত্র ৭ বছর বয়সে ইউনাইটেড যুবদলে খেলার সুযোগ হয়।সংসারের অভাব নানা টানাপোড়েনেও নিজের স্বপ্ন থেকে একটুও পিছপা হয়নি রাশফোর্ড। কিশোর বয়সে তার পা অস্বাভাবিক ভাবে এতই দীর্ঘ বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, শরীর অনুযায়ী সেই পা দিয়ে বল নিয়ন্ত্রণে রীতিমতো লড়াই করতে হতো। ফুটবল ক্যারিয়ারে মনোনিবেশ করার কারণে রাশফোর্ডকে ওষুধের প্রলোভন থেকেও বিরত থাকতে হয়েছিল।সে খুব দ্রুতই নিজেকে প্রমাণ করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের যুব দলের নিয়মিত সদস্য হয়ে ওঠে।

 

২০১১ সালে যুব দলের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য ছিলো রাশফোর্ড। সেবছর সে এফএ যুব কাপ জিতেছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে। ২০১৫ সালে তার জীবনে সফলতার খাতায় ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের নাম যোগ হয়। তবে ওয়াটফোর্ডের সেই ম্যাচে অবশ্য তাকে বেঞ্চে বসেই কাটিয়ে দিতে হয়। ২৫ শে ফেব্রুয়ারী ২০১৬ সালে তার ক্যারিয়ারের সুবর্ণ সুযোগ আসে ‘উয়েফা ইউরোপা লিগ ‘ এর রাউন্ড পর্বে। প্রস্তুতি ম্যাচে মার্শিয়াল ইঞ্জুরড হলে স্কোয়াডে অভূতপূর্ব ভাবে তার নাম আসে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামেন অভিষিক্ত রাশফোর্ড। খেলার দ্বিতীয়ার্ধে ২টি গোল আসে নিপুণ কৌশলে। ইউনাইটেড  ৫-১ গোল ব্যবধানে বড় জয় পায়। রাশফোর্ড ওই ম্যাচে সকল অতীতের রেকর্ড ভেঙে ইউরোপের প্রতিযোগিতামুলক লিগে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হিসেবে ফুটবল বিশ্বে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেয়। এর তিনদিন পরেই তার অভিষেক হয় ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে আর্সেনালের ম্যাচ দিয়ে। আর্সেনালের ম্যাচে রাশফোর্ড ২ গোল এবং ১ এসিস্ট করে হিরো হওয়ার পথে একধাপ এগিয়ে যায়। তারই কল্যাণে ৩-২ ব্যবধানে জয় পায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। আপনারা নিশ্চয় জানেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ ‘ম্যানচেস্টার ডার্বি’।

সেবছরই মাত্র ১৮ বছর বয়সে সবচেয়ে তরুণ খেলোয়াড় হিসেবে ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে একমাত্র জয়সূচক গোলটি করে রাশফোর্ড। ধীরে ধীরে অল  রেড সমর্থক গোষ্ঠীর কাছে আস্থার আর ভালোবাসার পাত্র হতে শুরু করে মার্কাস রাশফোর্ড। এরপর তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আন্তজার্তিক ম্যাচ খেলার বড় সুযোগ আসে ‘উয়েফা ইউরো-২০১৬’ তে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচে।এই ম্যাচে প্রথম গোল আসে তার পা থেকে। যার দরুন ২-১ গোলে জয় পায় ম্যান ইউ। সুযোগ পেলেই যেন নিজেকে মেলে ধরেন এক নতুন উচ্চতায়। এই ম্যাচে গোল করে ইংলিশ শিবিরের তারকা উয়েইন রুনির রেকর্ড ভেঙে আন্তর্জাতিক ম্যাচে প্রথম অভিষেক করা প্লেয়ার হিসেবে সর্ব কনিষ্ঠ খেলোয়াড়ের খাতায় নিজেকে প্রতিস্থাপন করেন।

জাতীয় দলের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ২০১৮ ফিফা বিশ্বকাপে স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচে জয়সূচক গোল করে ইংল্যান্ডকে জয় এনে দেয় রাশফোর্ড। ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতার এই খেলোয়াড় রাশফোর্ড তীব্র গতিতে ফুটবল নিয়ে ছুটতে পারে। তারসাথে দক্ষতা এবং ভারসাম্য ঠিক থাকায় সে হয়ে যায় ফুটবল সমর্থকদের কাছে প্রিয় মুখ। রাতারাতি তারকা খ্যাতি পায়নি এই উদয়ীমাণ তরুণ। তার ফুটবলের প্রতি একাগ্রতা তীব্র ইচ্ছাই আজ তাকে তারকা বানিয়েছে। তারকা হয়েও সে ভুলে যায়নি তার অতীত। ফুটবলের বাইরেও যে মানুষের একটি জগৎ আছে সেটি একজন খেলোয়াড় রাশফোর্ড নিজ কাঁধে দায়িত্ব নিয়ে প্রমাণ করে দিলো।

যুক্তরাজ্যের আইন প্রণেতারা এমন একটি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন যেটি স্কুল ছুটিতে বিদ্যালয়ে বাচ্চাদের বিনামূল্যে খাদ্যের ব্যবস্থা ছিল। যা দেশে ক্রমবর্ধমান ক্ষুধার সংকট কাটাতে সহায়তা করেছিল। এই ভোটের ফলে প্রায় পাঁচ ভাগেরও বেশি শিশু ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে। এই ভোটটি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এবং জাতীয় দলের হয়ে খেলা ইংল্যান্ডের অন্যতম তরুণ ফুটবল তারকা মার্কোস রাশফোর্ডকে হতাশ করেছিলো। তার ক্যাম্পেইনের ফলে সরকার গ্রীষ্মের অবকাশের ছুটিতে স্কুল শিশুদের খাওয়াতে বাধ্য হয়। রাশফোর্ড এই ভর্তুকিযুক্ত খাবার বাড়ানোর একটি প্রত্যাশী আবেদনপত্র লিখেছিল । এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সরকার তার আইন প্রণেতাদের এই স্বীদ্ধান্ত পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। রাশফোর্ড একটি বিবৃতিতে লিখেছিলো, “এটি কোনো রাজনীতি নয়, এটি মানবতা। এটি শিশুদের ব্যাপার। এই শিশুরাই এই দেশের ভবিষ্যত।” এগুলো কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়।

মহামারীজনিত ক্ষয়ক্ষতির ফলে ব্রিটেনের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমেছে। অনেকে চাকুরী হারিয়েছেন। অত্যন্ত ক্ষুধা সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের ৬ষ্ট ধনী দেশ(জিডিপির দ্বারা) হওয়া স্বত্তেও সেখানে ২২% মানুষ এবং ৩০% শিশু মানবেতর জীবনযাপন করছে। মহামারীর প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাজ্যে বসবাসরত অনেক পরিবার মারাত্মক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। শীতকালে কোভিড -১৯ সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে ক্ষুধার সমস্যাটি আরও খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় র‌্যাশফোর্ড জরুরি বিষয়গুলি আমলে নিয়ে তার টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে খাদ্য ব্যাংকগুলির জন্য একটি পাবলিক ডিরেক্টরিতে শিশুরা যেন ঠিকভাবে খাদ্য পায় সে সম্পর্কিত নির্দিষ্ট ঠিকানা এবং তথ্য ভাগ করে দিয়েছেন। রাশফোর্ড নিজেও গ্রেট ম্যানচেস্টারে বড় হওয়ার সাথে সাথে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছিলো তাই সে গ্রীষ্মের ছুটিতে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য খাবার সরবরাহ করতে সরকারকে বাধ্য করতে একটি অনলাইন পিটিশন সাইট খুলে। এই আবেদনে পাঁচ লক্ষেরও বেশি স্বাক্ষর পড়ে। রাশফোর্ড জুনে এক বার্তায় লিখেছে , ” ক্ষুধার্ত হতে কেমন লাগে তা আমি জানি। আমি ভাল করেই জানি যে, মাঝে মাঝে আমার বন্ধুরা তাদের বাবা-মায়ের সম্মতিতে আমাকে খেতে সন্ধ্যায় নিমন্ত্রণ করতো এবং আমি তা খেয়েছি।”

প্রাথমিকভাবে সরকার তার অনুরোধগুলিকে গ্রাহ্য করেনি। কিন্তু ১লা জুন জনগণ রাশফোর্ডের প্রচারের সমর্থনে জনসভা করে। এটি ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র যুক্তরাজ্যে। এরই ফলে ছয় সপ্তাহের মধ্যে ১.৩ মিলিয়ন শিশুকে বিনামূল্যে স্কুল খাবারের দাবি উঠে। সরকারকে ভবিষ্যতে স্কুল ছুটির সময় বিনামূল্যে বিদ্যালয়ে খাবার দেওয়ার যোগ্যতার মানদণ্ডকে আরো প্রসারিত করার দাবি জানানো হয়। যাতে করে আরো দরিদ্র শিশু খাবারের সুযোগ পায় সেই লক্ষ্যে আহ্বান করেন মার্কোস রাশফোর্ড। ১০ই অক্টোবর, কোভিড-১৯-এর সময় যুক্তরাজ্যের দরিদ্র শিশুদের জন্য তার এই অবদানের জন্যে দ্বিতীয় রানী এলিজাবেথ রাশফোর্ডকে পুরস্কৃত করেছিলেন। ম্যানচেস্টারবাসী র‍্যাশফোর্ডের কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ তার সম্মানার্থে একটি বিশাল ম্যুরাল তৈরি করেছেন।

মাত্র ২৩ বছর বয়সী খেলোয়াড় র‍্যাশফোর্ড জয় করে নিয়েছে মানুষের ভালোবাসা। এ যেন ফুটবলের রণক্ষেত্রে নতুন এক মানবিক রাশফোর্ড। বলা বাহুল্য ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, মোহাম্মদ সালাহ সহ অনেক ফুটবলাররাই বিভিম্ন দেশের নিপিড়ীত মানুষের জন্যে কাজ করে যাচ্ছে। তারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বিভিন্ন দাতব্য সংস্থায় সাহায্য করছে।। ফুটবলারদের মানবিক দিক দেখে আজ সত্যিই মনে হচ্ছে” সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।”