টাইগারদের অস্ট্রেলিয়া বধের গল্প

0
23

ঢাকা টেস্টের চতুর্থ দিন। মিরপুরে খেলোয়াড় থেকে শুরু করে দর্শক পর্যন্ত সবার চোখেমুখে যেন বিষণ্ণতার ছোয়া। কেননা দ্বিতীয় দিনে অজি বধ নামক যে রূপকথার আশা দেখাচ্ছিল বাংলাদেশ, তা পরের দিন শেষে প্রায় ফিকে যায়।
টেস্ট ক্রিকেটে সাধারণত চতুর্থ ইনিংসে ২৬৫ রানের লক্ষ্যকে মাঝারি মানের হলেও, তা এক সেশনেই মামুলি বানিয়ে দেন অসি ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার ও স্টিভ স্মিথ। একদিকে ওয়ার্নারের মারকুটে ব্যাটিং ও অপর দিকে স্মিথের ধৈর্য্যশীল ব্যাটিংয়ে তৃতীয় দিন শেষে ২ উইকেটে ১০৯ রান তুলে ফেলে অস্ট্রেলিয়া। জয়ের জন্য তখনো দরকার ছিল ১৫৬ রান, এবং তা পার করতে সময় আছে দুই দিন। তবে সেই লক্ষ্য পূরণ করতে দেড় সেশনের বেশি সময় লাগার কথা নয়।
এই ভেবেই হয়তো চতুর্থ দিন মাঠে নেমেছিল টাইগাররা! তবে এর মানে এই নয় যে জয়ের চেষ্টা করেনি মুশফিক-সাকিবরা। প্রথম সেশনের শুরু থেকেই ওয়ার্নার-স্মিথকে আউট করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যায় সাকিব-মিরাজ-তাইজুল স্পিন ত্রয়ী। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছিল না। এরই মাঝে হেসেখেলে নিজের ব্যক্তিগত সেঞ্চুরি তুলে নেন ওয়ার্নার। সেই সঙ্গে স্মিথও যেভাবে ব্যাট করছিলেন মনে হচ্ছিল ম্যাচ জিতিয়েই মাঠ ছাড়বেন তারা।


এরকম করে ঘন্টা পেরোনোর পর টাইগারদের ত্রাতা হয়ে উঠেন সাকিব। দারুণ এক ডেলিভারীতে সেঞ্চুরি করা ওয়ার্নারকে এলবিডব্লিউ ফাঁদে ফেলেন তিনি। এতে যেন প্রাণ ফিরে পায় মিরপুরের গ্যালারী। এর কিছুক্ষণ পরেই সাকিব অপর সেট ব্যাটসম্যান স্মিথকে মুশফিকের ক্যাচে পরিনত করলে উল্লাসে ফেটে পড়ে টাইগার ভক্তরা। পুরো স্টেডিয়াম জুড়ে চলতে থাকে সাকিব, সাকিব মুখোরিত ধ্বনি। কেননা এখান থেকে একমাত্র তিনিই পারেন এমন একটা ম্যাচে জয় ছিনিয়ে আনতে!
অপর দিক থেকে সাকিবকে যোগ্য সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছিলেন তাইজুল। তার বলে স্লিপে থাকা সৌম্যর হাতে ক্যাচ দিয়ে যখন পিটার হ্যান্ডসকম ড্রেসিং ফিরছিলেন, ততক্ষণে ক্যাঙ্গারুদের অর্ধেক ব্যাটিং দুর্গ ভেঙ্গে পড়েছে। লাঞ্চের তখনও প্রায় নয় ওভার দেরি। কিন্তু সাকিব যেন পণ করেছিলেন লাঞ্চ করার আগেই অসিদের আরো একটি উইকেট তুলে নিবেন তিনি! যেই কথা সেই কাজ। ক্রিজে থাকা ম্যাথু ওয়েডকে নিজের ঘূর্ণিতে পরাস্ত করে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন সাকিব। তার জোরালো আবেদনে সঙ্গে সঙ্গেই আঙুল তুলতে ভুল করলেন না আম্পায়ার আলিম দার। ওয়েডের উইকেটটি পেয়ে সাকিবের উদযাপনটি ছিল ঠিক বাচ্চাদের মতো। যেন তাকে থামানোর সাধ্য আর কারো হাতে নেই।
লাঞ্চের আগেই আরো একবার আঘাত অজি শিবিরে আঘাত হানেন তাইজুল। ফিরতি বলে দারুণ এক ক্যাচে অ্যাস্টন অ্যাগারকে ফিরিয়ে অসিদের সপ্তম উইকেটের পতন ঘটান এই বাঁহাতি স্পিনার। জয়ের আশা নিয়ে দিন শুরু করা অসিরা এখন প্রথম সেশন শেষে হারের মুখে। আর তা সম্ভব হয়েছে একমাত্র সাকিব আল হাসান এর কারণে। আর এতে পার্শ্বনায়কের ভূমিকা পালন করেন তাইজুল।
প্রথম সেশন শেষে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ ২ উইকেটে ১৫৮ রান থেকে ৭ উইকেটে ১৯৯ রান। তখনো অসিদের জয়ের আলো একটু হলেও জ্বলছিল। কেননা উইকেটে ছিলেন একমাত্র স্বীকৃত ব্যাটসম্যান গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। তড়িঘড়ি করে রান তোলতে বেশ ওস্তাদ তিনি। টাইগারদের জয়ের পথে এই কাঁটা সরানোর দায়িত্ব নিলেন আবারো সাকিব। লাঞ্চ শেষ করে আসার প্রথম বলেই ম্যাক্সওয়েলকে বোল্ড করে প্যাভিলিয়নের পথ দেখান বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার। অসি এই ব্যাটসম্যানকে আউট করে সাকিব যেন নাছোড়বান্দা। পাখির মত ডানা মেলে উড়তে থাকেন মিরপুরের আকাশে। হবেনই বা না কেন ম্যাক্সওয়েলকে আউট করেই ত ম্যাচে দ্বিতীয়বারের মতো পাঁচ উইকেট এবং মোট ১০ উইকেট লাভ করেন তিনি।

৯৯ রানে ৮ উইকেট হারানো অস্ট্রেলিয়াকে তখন যেকেউই বলে দিবে এই ম্যাচে পরাজয় বরণ করতে চলছে দলটি। তবে বাংলাদেশকে পেলেই যে টেল এন্ডার ব্যাটসম্যানরা পরিপক্ক হয়ে উঠেন সেটার প্রমান মিলেছে এই ম্যাচেও। ধীরে ধীরে ব্যাট করে নাথান লায়নের সঙ্গে ২৯ রানের জুটি গড়ে জয়ের প্রায় কাছে নিয়ে যান প্যাট কামিন্স। তবে ২২৮ রানে লায়নকে আউট করে টাইগার দের ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন মিরাজ। আত্মসম্মান বাঁচাতে ইনজুরড থাকা জশ হ্যাজেলউডকে ক্রিজে পাঠাতে বাধ্য হয় তখন অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু তাতে কোনো শেষরক্ষা হয়নি। কামিন্সের সঙ্গে ১৬ রানের জুটি গড়ার পর তাইজুলের ডেলিভারী বুঝে উঠার আগেই এলবিডব্লিউর ফাঁদে পরে অসিদের হার নিশ্চিত করেন হ্যাজেলউড। এবং ২০রানের অবিস্মরণীয় এক জয় পায় মুশফিক বাহিনী।
পুরো টাইগার শিবির তখন জয়ের উল্লাসে মত্ত। তাদেরই মতো খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠেছিলেন স্টেডিয়ামের ভিআইপি বক্সে বসা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ জয় পাওয়ার পরপরই ফোন হাতে এই সুসংবাদটা দেন পরিচিত কাউকে। এবং সঙ্গে থাকা লাল সবুজে আবৃত্ত পতাকাটি নাড়াতে থাকেন ক্রিকেটারদের উদ্দেশ্যে।
অবিস্মরণীর এই জয়ের পেছনে বড় অবদানটা কার। সেটা আলাদা করে বলার কোনো প্রয়োজন নেই। ব্যাট-বলে প্রায় নিয়মিতই দলের হয়ে অবদান রাখেন। তবে এদিন সাকিব যা করেছেন তাতে নিজেকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি। পুরো দলকে মুহূর্তের মধ্যেই আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর করে ফেলেন এই অলরাউন্ডার। তবে এর আগের দিন পুরো দলের মতো তারও জয় নিয়ে কোনো আত্মবিশ্বাস ছিল না। সেই জিনিসটা জাগিয়েছেন এমনি একজন যার ভূমিকা সাকিবের জীবনে অপরিসীম। তাই তো পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ম্যাচ সেরার পুরস্কার নিতে এসে তাকে কৃতিত্ব দিতে কোনো ভুল করলেন।
দাঁড়িয়ে থাকা ধারাভাষ্যকার শামীম চৌধুরীর থেকে মাইক নিয়ে দর্শকদের উদ্দেশ্যে সাকিব বলেন, ‘খেলার শুরুর দিকে আমাদের আত্মবিশ্বাস ছিল যে, আমরাই জিতব। তবে তৃতীয় দিন শেষে এসে আমাদের অনেকের মধ্যে মনে হয়েছিল ম্যাচটা জিততে পারব না। কিন্তু আপনারা দর্শকরাই আমাদের জিতিয়েছেন। আপনাদের আত্মবিশ্বাস ছিল এজন্য স্টেডিয়ামে এসেছেন, আমাদের উৎসাহ দিয়েছেন। এ কারণে আমরা ম্যাচটা জিতেছি। আপনাদের অশেষ ধন্যবাদ। আরও একটি ঘটনার কথা বলি, গতকাল রাতে আমি যখন আমার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছিলাম, তখন তাকে বলছিলাম যে আমরা মনে হয় হেরে যেতে পারি। তখন আমার স্ত্রী আমাকে সাহস জুগিয়ে বলেছিল, পারলে একমাত্র তুমিই পারো বাংলাদেশকে জেতাতে। সেখান থেকেই আমি আত্মবিশ্বাসটা পেয়েছিলাম।’
এছাড়াও এই জয়ের জন্য সাকিব কৃতিত্ব দিতে ভুললেন না সতীর্থদেরকে। তার মতে এই জয়ের পেছনে সবারই অবদান আছে। সাকিবের এই কথাকে মিথ্যে প্রমাণের কোনো সুযোগ নেই। সত্যিই ত সেই ম্যাচে যদি তামিম দুই ইনিংসে ৭০+ রান না করত, মুশফিক যদি দ্বিতীয় ইনিংসে ৪১ রান না করত কিংবা সৌম্য সেই ক্যাচ গুলো যদি ফেলে দিত আর তাইজুল-মিরাজ যদি সাকিবকে যোগ্য সঙ্গ না দিত তাহলে হয়ত অস্ট্রেলিয়া বধের এই রূপকথা লিখতে পারত না বাংলাদেশ।