জিদানঃ পরশপাথর কিংবা উত্থানের জাদুকর

0
56

উত্থান কিংবা পতন?

শৈশবে ফিনিক্স পাখির গল্প শোনেনাই এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া একটু কষ্টকর। পৌরাণিক কাহিনীর সেই ফিনিক্স পাখি আমাদের জীবনের সাথেই যেনো মিশে আছে। শত্রু আসার আগে নিজেই নিজের বাসা জ্বালিয়ে দেয়, ভস্ম হওয়া সেই বাসা থেকেই আবার জন্ম নেয় নতুন জীবন। মৃত থেকে আবারও নতুন জীবন ফিরে পাওয়া এই ফিনিক্সের সাথে আমরা তুলনা করি ঘুরে দাঁড়ানো মানুষের। খাদের কিনারা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রমাণ করা মানুষও যেনো একটা ফিনিক্স। নতুন জীবন পাওয়া এক বীর।

লা ডেসিমা জিতিয়ে কার্লো আনচেলেত্তি পরের মৌসুমেই বরখাস্ত হলেন। নতুন কোচের সাথেও খেলোয়াড়দের বনিবনা হচ্ছে না। রিয়াল মাদ্রিদের তখন বাজার মন্দা, দলের বাজে অবস্থা, ফুটবলারদের ফর্মহীনতা, লা-লিগায় পিছিয়ে, কোচের ভুল সিদ্ধান্তে কোপা দেল রে থেকেও নিষিদ্ধ। অতঃপর বরখাস্তের খাতায় নাম লেখালেন রাফায়েল বেনিতেজ, তাও আবার মৌসুমের মাঝপথেই।

কে হবে মাদ্রিদের নতুন কোচ? কে নেবে গ্যালাক্টিকোসদের দায়ভার? চওড়া কাঁধে সাদা বর্মের যোদ্ধাদের দায়িত্ব নেওয়া তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। তবে সবাইকে চমকে দিয়েই সামনে এগিয়ে আসলেন একজন প্রবাদ পুরুষ। কিংবদন্তি জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান। মাঝমাঠে জাদুর ছড়ি ঘোরানো ফুটবলার থেকে এবার হেডকোচ হয়ে ডাগ-আউটে থাকবেন। অভিজ্ঞতা বলতে মাদ্রিদের বয়সভিত্তিক দল ক্যাসিলায় দেড় বছর ছিলেন, আর এক বছর কার্লো আনচেলত্তির সহকারী হিসেবে মূল দলের পাশে থাকা। ফুটবলার হিসেবে সফল জিদান কি পারবেন এবার কোচ হয়ে নিজের জাত চেনাতে?
ভালো ফুটবলাররা ভালো কোচ হয় না, অতীত রেকর্ড তো তাই বলে। আসবে কি তাতে পরিবর্তন?

কোচিং ক্যারিয়ারের পয়লা ম্যাচেই করলেন বাজিমাৎ। ৫-০ গোলের বড় জয়। অনেকদিন ধরেই দমবন্ধ হয়ে থাকা নিঃশ্বাস টা ছাড়লো মাদ্রিদিস্তারা। ভালো দিন আসছে তবে? যদিও মূল পরীক্ষা তখনও বাকি।

খেলোয়াড়দের কাছে গুরুর চেয়ে বন্ধু হলেন আগে। ভাঙাচোরা দলকে গুছিয়ে আনলেন, পরষ্পরের বোঝাপড়া টা বাড়ালেন। ছন্নছাড়া মাদ্রিদ থেকে ইউরোপের সেরা দলে আবারও পরিণত হল রিয়াল মাদ্রিদ। লা উন ডেসিমা থেকে লা-লিগার ৩৩ তম শিরোপা। নূ ক্যাম্পে গিয়ে বার্সা কে হারিয়ে পূর্ণ ৩ পয়েন্ট লাভ কিংবা ভিসেন্তে ক্যালদারনতে গিয়ে সিমিওনের অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদকে নাকানিচোবানি খাওয়ানো, জিদানের জাদুর ছোঁয়ায় মাদ্রিদ থামিয়েছে ইতালির দলগুলোকেও, তাও ইতালির মাটিতেই।

১৯৮৮-৮৯ মৌসুমে লিও বেনহ্যাকার নামের এক ভদ্রলোকের রিয়াল মাদ্রিদ টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত থাকার ক্লাব রেকর্ড গড়েছিলেন। জিদানের অধীনে থাকা ঐ দল টা নিজেদের রেকর্ড টপকিয়ে বার্সার গড়া স্প্যানিশ রেকর্ড টাও ভেঙ্গে দিয়েছিলো। প্রথম বছরেই জিতলেন ৩ টি গুরুত্বপূর্ণ শিরোপা, পয়লা ১৭ মাসে ৫ টি শিরোপা। যে চ্যাম্পিয়নস লিগ একটা জিততে অন্য দলের ঘাম ছুটে সেই ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব দলকে এনে দিলেন টানা তিনবার। অবিশ্বাস্য?

সব ভালোরই নাকি মন্দ থাকে কিংবা সব মন্দের ভালো। হুট করেই কার জানি নজর পরলো জিদানের সোনার সংসারে। ২০১৮ সালের ৩১ শে মে হুট করেই জানিয়ে দিলেন ” অনেক হয়েছে, এবার একটু ছুটি চাই। ”

আড়ালে কথা ভেসে বেড়ায়, জিদান চেয়েছিলেন বেলকে বিক্রি করে দিতে আর রোনালদোকে দলে রেখে দিতে৷ কিন্তু পেরেজ মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো। একেবারে উল্টোটা করতে চাইলেন। আত্মসম্মানে ঘা লাগলো, সব জিতিয়েই চলে গেলেন। ক’মাস পরে রোনালদোও মাদ্রিদ ছাড়লো। শনির দশা কেবল লাগলো বলে!

ট্রফিলেস সিজন কাটানো টা অবিশ্বাস্য কিছু না। কিন্তু মৌসুমের মাঝেই দুইজন কোচকে ছাটাই করা৷ ইউরোপসেরা একটা দল তলানীর দলের সাথেও নিয়মিত নাকানিচুবানি খাচ্ছে। দলে নেই কোনো ঐক্য৷ কি হবে তবে রিয়াল মাদ্রিদের?

কিংবদন্তি আলফ্রেডো ডি স্টেফানোকে একবার এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিলো, ” রিয়াল মাদ্রিদ আপনার কাছে কি?” উত্তরে ডন বলেছিলেন,

” এটা একটা অনুভূতি। “

রিয়াল মাদ্রিদ মাদ্রিদিস্তাদের জন্য একটা অনুভূতিই। একবার যে মাদ্রিদকে ভালোবাসে সে আর ভুলতে পারে না তাকে৷ দলের এই ভগ্ন সময়ে পেরেজ আবারও হাত পাতলেন জিদানের কাছে। খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে পারলেন না জিদানও। আবারও ফিরে আসলেন।

প্রথম দিলেই ঘোষণা করলেন,

” আমি মাদ্রিদকে সেখানেই নিয়ে যাবো, যেখানে মাদ্রিদ ছিলো। “

ধরাছোঁয়ার বাইরে আবারও যাবে রিয়াল মাদ্রিদ? জিদানের প্রধান অস্ত্র সেই ক্রিশ্চিয়ানো তো আর দলে নেই। তাহলে? ঐ মৌসুমের শেষ কয়েকটা সেভাবেই শেষ করলেন। আসল খেলা হবে নতুন মৌসুমে, বিপক্ষ দলের প্রতি অনেকটা ” খেলা হবে, তোমরা আইসো সব নিয়ে। আমরা তৈরী। ”

স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন একবার বলেছিলেন,

” আক্রমণভাগ তোমাকে ম্যাচ জেতাবে, রক্ষণ জেতাবে শিরোপা। “

রোনালদো নাই, প্রতি ম্যাচে গোল করারও মানুষ নাই। তবে কি করা যায়? জিদান ফার্গির কথাটাকেই যেনো মনে গেথে নিলেন। ভঙ্গুর রিয়াল মাদ্রিদের ডিফেন্সকে বানালেন জমাট দেওয়াল। কামান দাগলেও যেনো তাতে ভাঙন ধরবে না। প্রথম মৌসুমে চরম বাজে খেলে ” মানবতার ফাক ” বনে যাওয়া বেলজিয়ান গোলরক্ষক হয়ে গেলেন বাজপাখি কিংবা নিরেট দেওয়াল। রামোস, ভারানে, কারভাহালরা অটল। নতুন আসা মেন্ডি তো মার্সেলোকে সরিয়ে প্রতিম্যাচে তার জায়গায় নিজের নাম বসিয়ে দিয়ে দিলেন। মিলিটাও খারাপ করছে না।

আগের মৌসুমেও বিপর্যস্ত মদ্রিচ যেনো আবারও জাদুকর হয়ে গেলেন। অনেকটা পুরোনো মদ, যত বয়স হচ্ছে ততো জাদু বাড়ছে। তাকে চ্যালেঞ্জ দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে গেলো অখ্যাত এক তরুন। ফেদে ভালভার্দে। ঐ দিকে টনি ক্রুসের বুলেটেও যেনো আবারও ধার বাড়লো। বেল ফর্মে নাই। দলে নতুন আসা হ্যাজার্ডকেও পাওয়া যাচ্ছে না। তাতে কি? নতুন জীবন পেলেন করিম মোস্তফা বেনজেমা। জিদানের অধীনে ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুমই উপহার দিলেন।

কোচ হয়ে এসে প্রথম এসাইনমেন্টেই সফল। স্প্যানিশ সুপার কাপে সেমিফাইনালে সবাই যখন চিন্তিত কি হতে পারে একাদশ, ঠিক তখনই সবাইকে হতবাক করে পাঁচ মিডফিল্ডার নিয়ে অদ্ভুতুড়ে এক ট্যাকটিস নিয়ে মাঠে নামালেন দলকে। ৩-১ এর জয় নিয়েই শক্ত প্রতিপক্ষ ভ্যালেন্সিয়াকে হারিয়ে ফাইনালে উঠলো রিয়াল মাদ্রিদ৷ আরেকবার নিজের জাত চেনানোর অপেক্ষায়।

সেমিফাইনালে মেসির বার্সাকে উড়িয়ে দিয়ে ফাইনালে উঠে আসা সিমিওনের অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। সবাই যখন ভাবছে এবার কি হবে রিয়াল মাদ্রিদের? আবারও সেই ৫ মিডফিল্ডার দিয়ে দল সাজালেন। ফলাফল, নতুন দশকের প্রথম শিরোপা রিয়াল মাদ্রিদের শোকেসে।

হ্যাঁ, জিদানে তবে ভরসা রাখাই যায়।

কোচ হয়ে ফিরে এসেই জিদান বলেছিলেন,

“আগামী মৌসুমে লা-লিগাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”

তো দেখা যাক জিদান তার কথা রাখতে পেরেছে কিনা?
২০১৯/২০ মৌসুম শেষে লা-লীগায়,
সর্বোচ্চ জয়ঃ রিয়াল মাদ্রিদের (২৬)।
সবচেয়ে কম হারঃ রিয়াল মাদ্রিদের (৩)।
সবচেয়ে কম গোল খাওয়ার রেকর্ডঃ রিয়াল মাদ্রিদের (২৩)।
সবচেয়ে বেশী ক্লিনশিটঃ রিয়াল মাদ্রিদের (১৯)।
এ্যাওয়ে ম্যাচে সবচেয়ে কম হারঃ রিয়াল মাদ্রিদের (৩)।
বিপক্ষের মাঠে সবচেয়ে বেশী জয়ঃ রিয়াল মাদ্রিদের (১১)।
ঘরের মাঠে সবচেয়ে কম হারঃ রিয়াল মাদ্রিদের (০)।

ফলাফলঃ মৌসুম শেষে ৩৪ তম লা-লীগা জয়ের সুবাসে মুখরিত স্পেন থেকে বাংলাদেশ। বিশ্বের আনাচে-কানাচেতে থাকা সব মাদ্রিদিস্তারাই জয়ের আনন্দে বিভোর। অথচ করোনা ভাইরাসের প্রকোপে খেলা বন্ধ হওয়ার আগে বার্সেলোনার চেয়ে টানা ২ পয়েন্টে পিছিয়ে ছিলো রিয়াল মাদ্রিদ। এমনকি, একটা মৌসুমের মধ্যভাগে ১১ ম্যাচে পয়েন্ট খুইয়েছিলো রিয়াল মাদ্রিদ। যার মধ্যে ৮ ম্যাচেই ড্র আর ৩ ম্যাচে হার।
সেই মাদ্রিদই আবারও খেলা শুরু হওয়ার পর টানা ১০ ম্যাচ জিতলো? সবমিলিয়ে ১১ ম্যাচে অপরাজিত। এক ম্যাচ হাতে রেখেই চ্যাম্পিয়ন।
অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়, ভুতুড়ে নাকি কঠোর পরিশ্রমের সাথে টেকো মাথার এক জাদুকরের ছোঁয়া?

দুই ধাপে রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হিসেবে থাকা জিনেদিন জিদান প্রথম ধাপে ১৪৯ ম্যাচে ১০৪ জয়, ২৯ ড্র, ১৬ হারের সাথে দেখা পেয়েছিলেন ৯ টা ট্রফির। আর পরের ধাপে ৬১ ম্যাচে ৩৭ জয়ের সাথে ১৪ ম্যাচে ড্র আর ১০ ম্যাচে হার। সাথে থাকছে দুইটা বড় শিরোপার ছোঁয়া।

২০১৬ সাল থেকে কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করার পর থেকে সবচেয়ে বেশী ১১ টা শিরোপাও জিতেছেন এই ফ্রেঞ্চ জিনিয়াস। কোচিং ক্যারিয়ারের মোট ১৫ টা শিরোপা জয়ের কাছাকাছি গিয়ে ১১ টাই জিতেছেন। ৭৫% ই জয়ের স্বাদ। অথচ, মাঝে ১০ মাসেরও উপরে কোচিং ক্যারিয়ার থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন। ফিরেই সেই জাদু, তাও আবার ক্রিশ্চিয়ানল রোনালদোকে ছাড়াই!

“জিদানের ছোঁয়া যেখানেই লাগে তাই সোনায় রুপান্তরিত হয়।”

লিগ জয়ের পর উপরের কথাটা বলেছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের অধিনায়ক সার্জিও রামোস

আমরাও তা মানি, জানি, বুঝি। জিদান পারবেন, জিদান পেরেছেন, জিদানের জাদু চলতে থাক।

টেকো মাথার জিনিয়াস, নিপাট ভদ্রলোক, ফুটবলের জাদুকর, আপনাকে লাল সালাম, মন থেকে ধন্যবাদ।