ক্লাব বার্সেলোনার ইতিহাস

0
956

১৮৯৯ সালের ২২ অক্টোবর, হুয়ান গ্যাম্পার ‘‘লস দেপোর্তেস’’ পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে ফুটবল ক্লাব প্রতিষ্ঠা করতে তার আগ্রহ প্রকাশ করেন। ২৯ নভেম্বর, জিমনাসিও সোলে একটি সম্মেলনে তিনি ইতিবাচক সাড়া পান। সম্মেলনে এগারো জন খেলোয়াড় উপস্থিত ছিলেন। তারা হলেন: গুয়ালতেরি ওয়াইল্ড, লুইস ডি’ওসো, বার্তোমেউ তেরাদাস, অটো কুঞ্জলে, অটো মায়ের, এনরিক ডুক্যাল, পেরে ক্যাবত, জোসেপ লোবেত, জন পার্সনস এবং উইলিয়াম পার্সনস। এভাবে জন্ম নেয় ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা ।

‘লস দেপোর্তেস’’ পত্রিকায় হুয়ান গ্যাম্পারের দেওয়া বিজ্ঞাপন।

১৮৯৯ সালের ৮ ডিসেম্বর। ক্লাবটি প্রতিষ্ঠার ৯ দিন পর প্রথম ফ্রেন্ডলি ফুটবল ম্যাচ খেলে ইংলিশ কলোনির বিপক্ষে। বার্সেলোনা শহরের বর্তমান টুর পার্কে অনুষ্ঠিত এ খেলায় মাঠের অবস্থা ছিল শোচনীয়। পাথর কণায় ভরা এবড়ো-থেবড়ো মাঠ। পাশে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। উপরন্তু খেলোয়াড়দের গায়ে কোনো জার্সি ছিল না। কারণ, ২৯ নভেম্বর ক্লাব প্রতিষ্ঠাকালীন মিটিংয়ে বার্সার জার্সি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি তখনো। সর্বশেষ সমস্যাটি ছিল খেলোয়াড় সংকট। আর এ কারণে এই ম্যাচে ১১ জনের বদলে দু’পক্ষে ১০ জন করে খেলতে নেমেছিল। ওই ফ্রেন্ডলি ম্যাচে বার্সা ইংলিশদের বিপক্ষে ০-১ গোলে পরাজিত হয়।

প্রথম দিকে বার্সা ক্লাব লোগো হিসেবে বার্সেলোনা মিউনিসিপ্যাল সিটির নিজস্ব লোগোটি ব্যবহার করছিল। খেলায়াড়গণ এটি নিজেদের শার্টে পরিধান করতেন। প্রথম লোগোটি চারভাগে বিভক্ত হীরক আকৃতির। উপরে একটি মুকুট তার উপরে একটি বাদুরের প্রতিকৃতি। লোগোর পাশ ছিল দু’টি গাছের শাখা দিয়ে ঘেরা। পরে ১৯১০ সালে ক্লাব লোগোর পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়। লোগোর ডিজাইনের উপর ক্লাব সদস্যদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা হয়েছিল। তাতে বিজয়ী হন ক্লাবেরই খেলোয়াড় কার্লোস কোমামালা। তার প্রস্তাবনায় লোগোর উপরের অংশে বাঁ-দিকে বসানো হয় সেন্ট জর্জের ক্রুশ আর ডানে কাতালোনিয়ার পতাকা। নিচের অংশে দলীয় রং। ১৯১০ সালের পর লোগোর বিশেষ পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে একনায়ক ফ্রাংকোর আমলে লোগোর উপর লেখা FCB পরিবর্তন করে CFB বসানো হয়। পরে ১৯৭৪ সালে ফ্রাংকো শাসনের অবসান ঘটলে, আবার ১৯১০ সালে করা ডিজাইন ফিরিয়ে আনা হয়। ডিজাইনের সর্বশেষ সংশোধনী করেন ক্লারেত সিরাহিমার ২০০২ সালে।

ক্লাবটির প্রথম জার্সি ছিল গাড় নীল ও লাল দুই রঙে ডিজাইন করা। আর প্যান্ট ছিল সাদা রঙের। ১৯০০ সালে ইসপানিয়ার বিপক্ষে প্রথম এই জার্সি পরে বার্সা খেলতে নামে। জার্সি রঙের ডিজাইনার নিয়ে মতভেদ আছে। লেখক টনি স্ট্রাবেলের মতে, এ রঙগুলো প্রথম ফরাসি প্রজাতন্ত্র থেকে নেয়া। তবে কাতালানদের ধারণা, রঙগুলো প্রতিষ্ঠাতা জোয়ান গাম্পারের নিজের পছন্দ করা। যা তার দেশ সুইজারল্যান্ডের দল এফসি বাসেলের।

ক্লাবটির সুদীর্ঘ ১১৫ বছরের ইতিহাসে মোট ৪১ জন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ওয়াল্টার উইল্ড। একজন সুইস নাগরিক। ১১ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের মধ্যে তিনিই ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ। আর প্রতিষ্ঠাতা জোয়ান গাম্পার ছিলেন বার্সা দলের প্রথম অধিনায়ক।

বার্সার প্রতিষ্ঠাতা হুয়ান গ্যাম্পার

আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে সফলভাবেই শুরু করে বার্সেলোনা। বার্সার প্রথম শিরোপা ‘কোপা মাকায়া’ আসে ১৯০২ সালে। একই বছরে ‘কোপা দেল রে’ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে এবং ফাইনালে ভিজকায়ার (বর্তমান অ্যাথলেতিক বিলবাও) সঙ্গে পরাজিত হয়। এ সময়টার পর ক্লাবের অর্থনৈতিক সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। অর্থের অভাবে ১৯০৫ সালের পর থেকে আর কোনো শিরোপা জিততে পারছিল না বার্সা। বার্সার ওই কঠিন সময়ে ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠাতা জোয়ান গাম্পার দলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি মোট ২৫ বছর ক্লাবের পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। ক্লাবের অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটাতে তার উদ্যোগে বার্সেলোনা প্রথম নিজস্ব স্টেডিয়াম ‘কাম্পো দে লা ইন্দোস্ত্রিয়া’ প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯০৯ সালের ১৪ মার্চ থেকে অনুষ্ঠানিকভাবে বার্সা নিজেদের স্টেডিয়ামে চলে আসে। এতে বার্সা আয়ের একটি স্থায়ী উৎস পেয়ে যায়। স্টেডিয়ামের ধারণ ক্ষমতা ছিল ৮ হাজার। ১৯২২ সালে বার্সা ‘কাম্পো দে লেস কোর্রস’ স্টেডিয়ামে আসে। যার ধারণ ক্ষমতা ছিল ২২ হাজার। পরে এর ধারণ ক্ষমতা ৬০ হাজার পর্যন্ত উন্নীত করা হয়।

এরপর লেস কোর্রস স্টেডিয়ামটির সম্প্রসারণ আর সম্ভব ছিল না। ১৯৪৮ ও ১৯৪৯ সালে টানা দুইবার ‘লা লিগা’ শিরোপা জেতার পর বার্সেলোনার স্টেডিয়ামে দর্শক সংখ্যা আরো বাড়িয়ে তোলে। দর্শকের তুলনায় ৬০ হাজার আসন ছিল অপর্যাপ্ত। ফলে বার্সেলোনা আরো বেশি ধারণ ক্ষমতাসহ নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা করে।

১৯৫৪ সালের ২৮ মার্চ বর্তমান ‘কাম্প ন্যূ’ নির্মাণকাজে হাত দেয়। প্রায় ৬০ হাজার বার্সার সমর্থকের উপস্থিতিতে স্টেডিয়ামটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বার্সেলোনার গভর্নর ফেলিপ আচেদো। নির্মাণ ব্যয় ছিল ২৮৮ মিলিয়ন পেসেতা (তৎকালীন স্প্যানিশ মুদ্রা)। পরবর্তীতে উয়েফা নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার জন্য ১৯৮০ সালে পুনরায় স্টেডিয়ামটির ডিজাইন পাল্টানো হয়। এ সময় নির্মাণকাজে ব্যবহৃত প্রত্যেকটি ইটে কিছু অর্থের বিনিময়ে সমর্থকদের নাম অন্তর্ভূক্ত করার সুযোগ দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। পরিকল্পনাটি দারুণ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। অসংখ্য সমর্থক এ সুযোগ নিয়ে বার্সাকে আর্থিক সমর্থন দেয়। এ ঘটনায় মাদ্রিদের সংবাদ মাধ্যম প্রচার করে যে স্টেডিয়ামের একটি ইটে রিয়াল মাদ্রিদের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও ফ্রাংকোর সমর্থক সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর নাম লেখা হয়েছে। পরে এ সংবাদটি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

 

প্রজাতন্ত্র ও গৃহযুদ্ধ (১৯২৩–১৯৫৭)

১৯৩৮ সালে বার্সেলোনায় চালানো বিমান হামলা।

 

১৯২৫ সালের ১৪ জুন, স্টেডিয়ামের দর্শকগন স্পেনের জাতীয় সঙ্গীতের ব্যঙ্গ করে এবং ‘‘God Save The King’’ সঙ্গীতের প্রতি সম্মান জানিয়ে মিগুয়েল প্রিমো দে রিভেরার একনায়কতন্ত্রের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ জানায়। এর ফলে, স্টেডিয়ামটিকে প্রতিহিংসামূলকভাবে ছয় মাসের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং গাম্পারকে পরিচালকের পদ হতে সরে যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়।১৯২৬ সালে, ক্লাবের পরিচালনা পরিষদ ক্লাবটিকে প্রথমবারের মত পেশাদার ক্লাব হিসেবে ঘোষনা করে।

১৯২৮ সালে বার্সেলোনা কোপা দেল রে শিরোপা জিতে। ‘‘Oda a Platko’’ নামক একটি কবিতা আবৃতি করার মাধ্যমে তারা এই জয় উত্‍যাপন করে। কবিতাটি লিখেছিলেন রাফায়েল অ্যালবার্তি, যিনি বার্সেলোনার গোলরক্ষকের দূর্দান্ত নৈপূন্যে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।ব্যক্তিগত ও আর্থিক সমস্যার কারণে হুয়ান গাম্পের বিষন্ন হয়ে পড়েন। ১৯৩০ সালের ৩০ জুলাই, তিনি আত্মহত্যা করেন।

খেলাধুলার উপর রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে শুরু করলেও ক্লাবটি ১৯৩০, ১৯৩১, ১৯৩২, ১৯৩৪, ১৯৩৬ ও ১৯৩৮ সালে কাতালান কাপ জিতে।১৯৩৬ সালে স্পেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার এক মাস পর বার্সেলোনা ও অ্যাথলেতিক বিলবাও-এর কয়েকজন খেলোয়াড়কে সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন এমন ব্যক্তিদের সাথে তালিকাভুক্ত করা হয়। ৬ আগস্ট, ক্লাব প্রেসিডেন্ট ইয়োসেপ সানিওলকে হত্যা করে স্পেনের রাজনৈতিক দল ফালাঞ্জের সেনারা। ইয়োসেপ সানিওল ছিলেন কাতালানদের স্বাধীনতার স্বপক্ষে।

১৯৩৭ সালের গ্রীষ্মে, বার্সেলোনা মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্র সফর করে। এই সফর ক্লাবটিকে অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়। ১৯৩৮ সালের ১৬ মার্চ, বার্সেলোনাতে বিমান হামলা চালানো হয়। এতে তিন হাজারেরও বেশি প্রাণহানি ঘটে। এমনকি একটি বোমা ক্লাবের অফিসেও আঘাত হানে। কয়েক মাস পর, কাতালোনিয়া দখলদারিত্বের অধীনে আসে। গৃহযুদ্ধ শেষে কাতালান পতাকা বাতিল করে দেওয়া হয় এবং ক্লাবগুলোর অ-স্পেনীয় নাম ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘‘ক্লাব দে ফুটবল বার্সেলোনা’’ এবং তাদেরকে কাতালান পতাকাও সড়িয়ে ফেলতে হয়।

১৯৪৩ সালে, কোপা দেল রে-এর সেমিফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের মুখোমুখি হয় বার্সেলোনা। প্রথম লেগের খেলায় লেস কোর্তস্ স্টেডিয়ামে বার্সেলোনা ৩–০ ব্যবধানে জয় লাভ করে। দ্বিতীয় লেগের খেলা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পূর্বে স্পেনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রধান বার্সেলোনার ড্রেসিং রুমে প্রবেশ করেন। তিনি খেলোয়াড়দেরকে মনে করিয়ে দেন যে তারা শুধুমাত্র শাসকদের উদারতার কারণে খেলতে পারছেন। খেলায় রিয়াল মাদ্রিদ ১১–১ ব্যবধানে জয় লাভ করে।রাজনৈতিক দূরবস্থা সত্বেও, ১৯৪০ ও ১৯৫০ এর দশকে বার্সেলোনা তাদের সফলতার ধারা বজায় রাখে। ১৯৪৫ সালে, ইয়োসেপ সামিতেরের মত ম্যানেজার এবং সিজার রামালেতস ও ভালেস্কোর মত খেলোয়াড়দের নিয়ে বার্সেলোনা লা লিগা শিরোপা জিতে। ১৯২৯ সালের পর এটিই ছিল তাদের প্রথম লা লিগা শিরোপা। ১৯৪৮ এবং ১৯৪৯ সালেও তারা লা লিগা শিরোপা জিতে। ঐ বছর তারা কোপা লাতিনা শিরোপাও জিতে। ১৯৫০ সালের জুনে, বার্সেলোনা লাদিসলাও কুবালার সাথে চুক্তি করে।

১৯৫১ সালে একটি বৃষ্টিবহুল রবিবারে, সান্তেনদারের বিপক্ষে খেলায় বার্সেলোনা ২–১ ব্যবধানে জয় লাভ করে। খেলা শেষে লেস কোর্তস্ স্টেডিয়ামের দর্শকগন কোন ট্রামগাড়ী না নিয়ে পায়ে হেঁটে রওনা দেয়। যা ফ্রাংকো কর্তৃপক্ষের কাছে ছিল বিস্ময়কর। বার্সেলোনায় একটি ট্রাম ধর্মঘট সংঘটিত হয়, যা বার্সেলোনা সমর্থকদের সমর্থন পেয়েছিল। এ ধরণের আরও অনেক ঘটনা ক্লাবটিকে কাতালোনিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত করে তোলে। অনেক প্রগতিশীল স্পেনীয় নাগরিক ক্লাবটিকে অধিকার ও স্বাধীনতার রক্ষাকারী হিসেবে দেখতে থাকেন।

ম্যানেজার ফেদ্রিনান্দ ডওচিক ও কুবালা ১৯৫২ সালে দলটিকে পাঁচটি আলাদা শিরোপা এনে দেন। এর মধ্যে ছিল, লা লিগা, কোপা দেল জেনেরালিসিমো (কোপা দেল রে), কোপা লাতিনা, কোপা ইভা দুয়ার্তে এবং কোপা মার্তিনি রোসি। ১৯৫৩ সালে, বার্সেলোনা আবারও লা লিগা ও কোপা দেল জেনেরালিসিমো জিতে।

ক্লাব দে ফুটবল বার্সেলোনা (১৯৫৭—১৯৭৮)

১৯৫৭ সালে ক্লাবের সমর্থকদের আর্থিক সহায়তায় ক্যাম্প ন্যু স্টেডিয়াম প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৫৯ সালে বার্সেলোনা জাতীয় পর্যায়ে ডাবল শিরোপা জিতে। ১৯৬০ সালে লা লিগা ও ইন্টার সিটিজ ফেয়ার্স কাপ নিয়ে আবারও ডাবল শিরোপা জিতে বার্সেলোনা। ১৯৬১ সালে ইউরোপীয়ান কাপে (বর্তমানে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ) প্রথম দল হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদকে হারানোর কৃতিত্ব অর্জন করে বার্সেলোনা। কিন্তু বেনফিকার কাছে ফাইনালে ৩–২ ব্যবধানে হেরে যায় তারা।

১৯৬০ এর দশকে বার্সেলোনা খুব বেশি সফলতা পায়নি। এ সময় লা লিগায় একচেটিয়াভাবে রাজত্ব করে রিয়াল মাদ্রিদ। ক্যাম্প ন্যু-এর নির্মাণ কাজ ১৯৫৭ সালে শেষ হয়, ফলে খেলোয়াড়দের পেছনে ব্যয় করার জন্য কিছু পরিমান টাকা ক্লাবটির কাছে ছিল।ইতিবাচক দিকগুলোর মধ্য ছিল, ঐ দশকে ইয়োসেপ মারিয়া ফুস্তে ও চার্লস রেক্সাসের মত খেলোয়াড়দের উদ্ভব ঘটে এবং বার্সেলোনা ১৯৬৩ সালে কোপা দেল জেনেরালিসিমো ও ১৯৬৬ সালে ফেয়ার্স কাপ জিতে। ১৯৬৮ সালে সান্তিয়াগো বের্নাব্যুতে রিয়াল মাদ্রিদকে কোপা জেনেরালিসিমোর ফাইনালে ০–১ ব্যবধানে হারিয়ে বার্সেলোনা তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পায়। ১৯৭৪ সালে ফ্রাংকোর একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটলে বার্সেলোনা ক্লাবের নাম পরিবর্তন করে পুনরায় ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা রাখা হয়। ক্লাবের প্রতীকটিও পরিবর্তন করা হয় এবং তাতে প্রকৃত বর্ণগুলো ফিরিয়ে আনা হয়।

১৯৭৩–৭৪ মৌসুমে বার্সেলোনায় যোগ দেন জোহান ক্রুইফ। তাকে ডাচ ক্লাব এএফসি আয়াক্স হতে ৯২০,০০০ ইউরোর বিনিময়ে ক্রয় করে বার্সেলোনা। তিনি নেদারল্যান্ডসের একজন প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি ইউরোপীয় সংবাদ মাধ্যমকে বলেছিলেন যে তিনি রিয়াল মাদ্রিদের চেয়ে বার্সেলোনাকে বেশি পছন্দ করেন কারণ তিনি এমন কোন ক্লাবে খেলতে চান না যেখানে ফ্রাংকো সহযোগীতা করে। এই কথার মাধ্যমে ক্রুইফ খুব দ্রুতই বার্সেলোনা সমর্থকদের মন জয় করে ফেলেন। সমর্থকদের কাছে তিনি আরও পছন্দের একজন হয়ে ওঠেন, যখন তিনি তার ছেলের নাম হিসেবে কাতালান নাম ‘‘জর্দি’’ ব্যবহার করেন (জোহান জর্দি ক্রুইফ)।

জোয়ান ম্যানুয়েল আসেন্সি, চার্লস রেক্সাস ও হুগো সতিলের মত দক্ষ খেলোয়াড়দের নিয়ে ১৯৭৩–৭৪ মৌসুমে তিনি দলকে লা লিগা শিরোপা এনে দেন। ১৯৬০ সালের পর এটিই ছিল বার্সেলোনার প্রথম লা লিগা শিরোপা। তারা সান্তিয়াগো বের্নাব্যুতে রিয়াল মাদ্রিদকে ৫–০ ব্যবধানে হারায়। ১৯৭৩ সালে ক্রুইফকে ইউরোপীয় বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার দেওয়া হয়। এটি ছিল তার দ্বিতীয় বালোঁ দ’অর, প্রথমটি তিনি ১৯৭১ সালে আয়াক্সে খেলার সময় জিতেছিলেন। ১৯৭৪ সালে তিনি তৃতীয়বারের মত বালোঁ দ’অর জিতেন। ঐ সময় তিনি তিনটি বালোঁ দ’অর জেতা একমাত্র খেলোয়াড় ছিলেন।

নুনিয়েজ যুগ (১৯৭৮–২০০০)

১৯৭৮ সালে ক্লাবের সদস্যদের দ্বারা ক্লাব প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ইয়োসেপ লুইস নুনিয়েজ। নুনিয়েজের প্রধান লক্ষ্য ছিল বার্সেলোনাকে মাঠ ও মাঠের বাহিরে একটি বিশ্বমানের ক্লাবে পরিণত করা। ১৯৭৯ সালের ২০ অক্টোবর, জোহান ক্রুইফের অনুরোধে বার্সেলোনার যুব একাডেমী লা মাসিয়া চালু করেন নুনিয়েজ।তিনি ২২ বছর যাবত্‍ বার্সেলোনার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এ সময় তিনি বেতন ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কঠোর নীতি অবলম্বন করেন।

১৯৭৯ সালের ১৬ মে, ফরচুনা ডুসেলডোর্ফকে ৪–৩ ব্যবধানে হারিয়ে বার্সেলোনা প্রথমবারের মত কাপ উইনার্স কাপ জিতে। বাসেলে অনুষ্ঠিত ঐ ফাইনাল খেলাটি গ্যালারিতে বসে ৩০,০০০ এরও বেশি ব্লাউগ্রানা সমর্থক উপভোগ করেন। ১৯৮২ সালের জুনে, দিয়েগো মারাদোনাকে বোকা জুনিয়র্স থেকে রেকর্ড ৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে কিনে নেয় বার্সেলোনা।

পরের মৌসুমে ম্যানেজার সিজার লুইস মেনোত্তির অধীনে রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে কোপা দেল রে শিরোপা জিতে বার্সেলোনা। বার্সেলোনাতে মারাদোনা বেশি দিন ছিলেন না। তিনি বার্সা ছেড়ে নাপোলিতে চলে যান। ১৯৮৪–৮৫ মৌসুমে টেরি ভেনাবল্সকে ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার অধীনে বার্সেলোনা লা লিগা শিরোপা জিতে। পরের মৌসুমে ভেনাবল্সের অধীনে বার্সেলোনা দ্বিতীয়বারের মত ইউরোপীয়ান কাপের (বর্তমানে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ) ফাইনালে ওঠে। ফাইনালে স্তেউয়া বুকুরেস্তির বিপক্ষে নাটকীয়ভাবে পেনাল্টিতে হেরে যায় বার্সেলোনা।

১৯৮৬ ফিফা বিশ্বকাপের পর প্রতিযোগিতার সর্বোচ্চ গোলদাতা গ্যারি লিনেকার এবং গোলরক্ষক আন্দোনি জুবিজারেতাকে দলে ভিড়ানো হয়। এরপরও সফলতার দেখা পায়নি বার্সেলোনা। ১৯৮৭–৮৮ মৌসুমের শুরুর দিকে ভেনাবল্সকে বহিষ্কার করে লুইস আরাগোনসকে দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। খেলোয়াড়রা প্রেসিডন্ট নুনিয়েজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। কোপা দের রে’র ফাইনালে রিয়াল সোসিয়েদাদকে ১–০ ব্যবধানে হারিয়ে মৌসুম শেষ করে বার্সেলোনা।

ড্রিম টিম

বার্সার সোনালী যুগের প্রণেতা জোহান ক্রুইফ।

১৯৮৮ সালে জোহান ক্রুইফ ম্যানেজার হিসেবে দলে ফিরে আসেন। তিনি পেপ গার্দিওলা, জোসে মারি বাকেরো, জিকি বেগিরিস্তেইনের মত স্পেনীয় খেলোয়াড়দের এবং রোনাল্দ কোয়ম্যান, মাইকেল লওড্রাপ এবং রোমারিওর মত আন্তর্জাতিক তারকাদের একত্রিত করেন। তার অধীনে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত টানা চার মৌসুমে বার্সেলোনা লা লিগা শিরোপা জিতে। তারা ১৯৮৯ সালে কাপ উইনার্স কাপের ফাইনালে এবং ১৯৯২ সালে ইউরোপীয় কাপের (বর্তমান চ্যাম্পিয়ন্স লীগ) ফাইনালে স্যাম্পদোরিয়াকে হারায়। এছাড়া তারা, ১৯৯০ সালে কোপা দেল রে, ১৯৯২ সালে ইউরোপীয়ান সুপার কাপ এবং তিনটি স্পেনীয় সুপার কোপা জিতে। ২০১১ সালে গার্দিওলার দায়িত্ব গ্রহনের আগ পর্যন্ত মোট ১১টি শিরোপা নিয়ে জোহান ক্রুইফ বার্সেলোনার সবচেয়ে সফল ম্যানেজার ছিলেন। তিনি টানা আট বছর বার্সেলোনার ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন। ক্রুইফের শেষ দুই মৌসুমে বার্সেলোনা কোন শিরোপার দেখা পায়নি। ফলে ম্যানেজারের দায়িত্ব থেকে ক্রুইফ সরে দাড়ান।

জোহান ক্রুইফের প্রস্থানের পর দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব দেওয়া হয় ববি রবসনকে। তিনি শুধুমাত্র ১৯৯৬–৯৭ মৌসুমেই ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় বার্সেলোনা চুক্তি করে রোনালদোর সাথে। কোপা দেল রে, কাপ উইনার্স কাপ এবং স্পেনীয় সুপার কোপা জেতার মাধ্যমে মৌসুম শেষ করে বার্সেলোনা। পরের মৌসুমে বার্সেলোনার ম্যানেজারের দায়িত্ব নেন লুইস ফন গাল।১৯৯৮ সালে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডকে হারিয়ে উয়েফা সুপার কাপ শিরোপা জিতে বার্সেলোনা। এছাড়া তারা কোপা দেল রে এবং লা লিগা শিরোপাও জিতে। ১৯৯৯ সালে রিভালদোকে ইউরোপীয় বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরষ্কার দেওয়া হয়। এতে করে তিনি বার্সেলোনার চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে এই পুরস্কার জেতার কৃতিত্ব অর্জন করেন। ঘরোয়া লীগে সাফল্য পেলেও চ্যাম্পিয়ন্স লীগে বারবার ব্যর্থ হওয়ার কারণে ২০০০ সালে ফন গাল এবং নুনেজ পদত্যাগ করেন।

নুনিয়েজের প্রস্থান, লাপোর্তার আগমন (২০০০–২০০৮)

২০০০ সালে, নুনিয়েজের প্রস্থানের পর বার্সেলোনার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন জোয়ান গাসপার্ত। তিনি তিন বছর এই দায়িত্বে ছিলেন। এসময়ে বার্সেলোনায় তিনবার ম্যানেজার পরিবর্তিত হয়। ২০০১ সালের এপ্রিলে, দ্বিতীয়বারের মত দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব নেন ফন গাল, কিন্তু ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে, তিনি এবং প্রেসিডেন্ট গাসপার্ত পদত্যাগ করেন।

একটি হতাশাজনক অধ্যায় শেষে ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন জোয়ান লাপোর্তা এবং ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব নেন প্রাক্তন ওলন্দাজ খেলোয়াড় ফ্রাংক রাইকার্ড। আন্তর্জাতিক তারকা খেলোয়াড় এবং স্থানীয় খেলোয়াড়দের সংমিশ্রনে গড়া দল নিয়ে পুনরায় সাফল্য পেতে শুরু করে বার্সেলোনা। ২০০৪–০৫ মৌসুমে তারা লা লিগা ও স্পেনীয় সুপার কোপা জিতে এবং দলের মাঝমাঠের খেলোয়াড় রোনালদিনহো জিতেন ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরষ্কার।

২০০৫–০৬ মৌসুমে বার্সেলোনা আবারও লা লিগা এবং স্পেনীয় সুপার কোপা শিরোপা জিতে। ২০০৬ সালের ১৭ মে, চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে আর্সেনালকে ২–১ ব্যবধানে হারায় বার্সেলোনা। খেলায় তারা ০–১ ব্যবধানে পিছিয়ে ছিল। কিন্তু খেলার শেষ ১৫ মিনিটে দুটি গোল করেন ইতো এবং বেলেত্তি। বিগত ১৪ বছরে এটিই ছিল বার্সেলোনার প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লীগ শিরোপা।

দূর্দান্তভাবে শুরু করা সত্ত্বেও, ২০০৬–০৭ মৌসুমে বার্সেলোনা শুধুমাত্র স্পেনীয় সুপার কোপা শিরোপা জিতে। ২০০৬ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে অংশগ্রহন করলেও ব্রাজিলীয় ক্লাব ইন্টারনাসিওনালের বিপক্ষে তারা পরাজিত হয়। শিরোপা ঘাটতি হিসেবে প্রাক মৌসুমে যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং রাইকার্ড ও ইতোর মধ্যকার পারস্পরিক দ্বন্দ্বকেই দোষারোপ করা হয়। লা লিগায় মৌসুমের অধিকাংশ সময়ই বার্সা প্রথম স্থানে ছিল, কিন্তু নতুন বছরে তাদের পরিবর্তনশীলতার কারণে রিয়াল মাদ্রিদ তাদেরকে টপকে যায়। মৌসুম শেষে বার্সেলোনা এবং রিয়াল মাদ্রিদের পয়েন্ট সমান হলেও মুখোমুখি লড়াইয়ে এগিয়ে থাকার কারণে শিরোপা জিতে মাদ্রিদ। চ্যাম্পিয়ন্স লীগে ওয়েডার ব্রেমেনকে ২–০ ব্যবধানে হারিয়ে কোনক্রমে গ্রুপ পর্ব টপকাতে সমর্থ হয় বার্সলোনা, কিন্তু রাউন্ড ১৬-তে লিভারপুলের বিপক্ষ হেরে তাদেরকে প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নিতে হয়।

বার্সেলোনার ২০০৭–০৮ মৌসুম কোন প্রকার শিরোপা ছাড়াই শেষ হয়। তারা তৃতীয় স্থানে থেকে লা লিগা শেষ করে এবং চ্যাম্পিয়ন্স লীগের সেমিফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে পরাজিত হয়ে প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নেয়।

গার্দিওলা যুগ (২০০৮–২০১২)

পেপ গার্দিওলাকে বার্সেলোনার ইতিহাসের সেরা কোচ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২০০৮ সালের জুনে, ফ্রাংক রাইকার্ডের স্থলাভিষিক্ত হন বার্সেলোনা বি দলের ম্যানেজার পেপ গার্দিওলা।  তিনি দলকে টিকি-টাকা কৌশলে খেলানো শুরু করেন, রোনালদিনিয়ো এবং ডেকোকে বিক্রয় করে জাভি, ইনিয়েস্তা এবং মেসিদের নিয়ে দল গড়তে শুরু করেন।

২০০৯ কোপা দেল রে’র ফাইনালে, অ্যাথলেটিক বিলবাওকে ৪–১ ব্যবধানে হারিয়ে ২৫তম বারের মত এই শিরোপা জেতার রেকর্ড গড়ে বার্সেলোনা। এর তিন দিন পরেই তারা রিয়াল মাদ্রিদকে ৬–২ ব্যবধানে হারায় এবং লা লিগা শিরোপা জিতে। চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ২–০ ব্যবধানে হারিয়ে তারা ২০০৮–০৯ মৌসুমে ট্রেবল শিরোপা জিতে। এটিই ছিল কোন স্পেনীয় ক্লাবের প্রথম ট্রেবল জয় এছাড়া তারা অ্যাথলেটিক বিলবাওকে হারিয়ে ২০০৯ স্পেনীয় সুপার কোপা  এবং সাখতার দোনেত্‍স্ককে হারিয়ে ২০০৯ উয়েফা সুপার কাপ শিরোপাও জিতে। ডিসেম্বরে, আর্জেন্টাইন ক্লাব এস্তুদিয়ান্তেসকে হারিয়ে তারা ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে  এবং এক পঞ্জিকাবর্ষে সাম্ভব্য ছয়টি শিরোপার সবকয়টি জেতার রেকর্ড গড়ে।  ২০১০ সালে, স্পেনীয় ফুটবলে বার্সেলোনা দুইটি নতুন রেকর্ড গড়ে। তারা ৯৯ পয়েন্ট নিয়ে লা লিগা শিরোপা এবং তাদের নবম স্পেনীয় সুপার কোপা শিরোপা জিতে।

২০১০ সালের জুনে, জোয়ান লাপোর্তার প্রস্থানের পর সান্দ্রো রসেলকে ক্লাব প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। এই নির্বাচন সংঘটিত হয় ১৩ জুন। নির্বাচনে তিনি মোট ভোটের ৬১.৩৫% পেয়ে নির্বাচিত হন। রসেল ভ্যালেন্সিয়া থেকে ডেভিড ভিয়াকে ৪০ মিলিয়ন ইউরো এবং লিভারপুল থেকে হ্যাভিয়ের মাশ্চেরানোকে ১৯ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ক্রয় করেন।  ২০১০ সালের নভেম্বরে, বার্সেলোনা তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদকে ৫–০ ব্যবধানে হারায়। ২০১০–১১ মৌসুমে ৯৬ পয়েন্ট নিয়ে বার্সেলোনা টানা তৃতীয়বারের মত লা লিগা শিরোপা জিতে।  ২০১১ সালের এপ্রিলে, কোপা দেল রে’র ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ১–০ ব্যবধানে হেরে যায় তারা।  ২০১১ সালের ২৮ মে, চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ৩–১ ব্যবধানে হারায় বার্সেলোনা। এটি ছিল তাদের চতুর্থ চ্যাম্পিয়ন্স লীগ শিরোপা।  ২০১১ সালের আগস্টে, লা মাসিয়া উদ্ভাবিত সেস্‌ ফ্যাব্রিগাসকে আর্সেনাল থেকে কিনে নেয় বার্সেলোনা, যিনি বার্সেলোনাকে স্পেনীয় সুপার কোপা জেতাতে সহায়তা করেন। এই শিরোপা জয়ের মাধ্যমে বার্সেলোনার মোট শিরোপা সংখ্যা দাড়ায় ৭৩-এ।

২৬ আগস্ট, উয়েফা সুপার কাপে পোর্তোকে ২–০ ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপা জিতে বার্সেলোনা। গোল দুইটি করেন লিওনেল মেসি এবং সেস্‌ ফ্যাব্রিগাস। এতে করে শিরোপা জয়ের দৌড়ে রিয়াল মাদ্রিদকে টপকে বার্সেলোনার মোট শিরোপা সংখ্যা দাড়ায় ৭৪-এ। এটি ছিল বার্সেলোনার ম্যানেজার হিসেবে পেপ গার্দিওলার ১৫তম শিরোপা। যা ছিল বার্সেলোনার একজন ম্যানেজারের সর্বোচ্চ শিরোপা জেতার রেকর্ড।

২০১২ উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগে বার্সেলোনা।
২০১১ সালের ডিসেম্বরে, ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ ব্রাজিলীয় ক্লাব স্যান্তোসকে ৪–০ ব্যবধানে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মত এই শিরোপা জিতে বার্সেলোনা। খেলায় লিওনেল মেসি দুইটি এবং জাভি ও ফ্যাব্রিগাস একটি করে গোল করেন। এতে করে গার্দিওলা যুগে বার্সেলোনার মোট শিরোপা সংখ্যা দাড়ায় ১৩।

বার্সেলোনার ২০১১–১২ মৌসুম শেষ হয় লা লিগা এবং চ্যাম্পিয়ন্স লীগ শিরোপা ছাড়াই। চ্যাম্পিয়ন্স লীগের সেমি-ফাইনালের প্রথম লেগে চেলসির কাছে ১–০ ব্যবধানে হেরে যায় বার্সেলোনা। লা লিগায় রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ঘরের মাঠে ১–২ ব্যবধানে পরাজিত হয় বার্সা। যা ঘরোয়া লীগের শিরোপা মোটামুটিভাবে নির্ধারন করে ফেলে।চেলসির বিপক্ষে দ্বিতীয় লেগে বার্সেলোনা ২–০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও খেলাটি শেষ হয় ২–২ সমতায়। খেলায় মেসি একটি গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি মিস করেন। ফলে দুই লেগ মিলিয়ে ৩–২ ব্যবধানে প্রতিযোগিতার ফাইনালে পৌছায় চেলসি।

এর কিছুদিন পরেই কোচ গার্দিওলা ঘোষনা করেন যে তিনি বার্সেলোনার সাথে চুক্তি নবায়ন করবেন না। ৩০ জুন তিনি কোচের পদ থেকে সরে দাড়াবেন এবং তার স্থলাভিষিক্ত হবেন সহকারী কোচ টিটো ভিলানোভা। কোপা দেল রে’র ফাইনালে অ্যাথলেটিক বিলবাওকে ৩–০ ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপা জেতার মাধ্যমে বার্সেলোনায় তার কার্যকালের ইতি টানেন গার্দিওলা। তার অধীনে বার্সেলোনা মোট ১৪টি শিরোপা জিতে।

গার্দিওলার শিরোপাময় চারটি বছরে অনুপ্রানিত হয়ে ব্রিটিশ পরিচালক পল গ্রীনগ্র্যাস কাতালান জায়ান্টদের নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেন। এই তথ্যচিত্রের শিরোনাম দেওয়া হয় ‘‘বার্সা (Barça)’’। ২০১৪ ফিফা বিশ্বকাপের পূর্বে এর কাজ সম্পন্ন হবে।

রোসেল ও বার্তোমেউ যুগ (২০১২—বর্তমান)

২০১৩ উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে বার্সেলোনা।
২০১২ সালের গ্রীষ্মে, বার্সেলোনা ঘোষনা করে যে সহকারি ম্যানেজার টিটো ভিলানোভা, পেপ গার্দিওলার স্থলাভিষিক্ত হবেন। টিটোর দায়িত্ব গ্রহনের পর স্পেনীয় সুপার কাপে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে পরাজিত হলেও, দূর্দান্তভাবে মৌসুম করে বার্সেলোনা। মৌসুমের পুরোটা সময় লীগ টেবিলের শীর্ষে ছিল তারা। মাত্র ২টি পরাজয় নিয়ে লীগে তারা ১০০ পয়েন্ট অর্জন করে। এবারও দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন লিওনেল মেসি। লীগে তিনি করেন ৪৬ গোল, সাথে ছিল ২টি হ্যাট্রিক। ২০১৩ সালের ১১ মে, বার্সেলোনা তাদের ২২তম লীগ শিরোপা জিতে। তখনও লীগের আরও চারটি খেলা অবশিষ্ট ছিল। শেষ পর্যন্ত বার্সেলোনা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি রিয়াল মাদ্রিদের চেয়ে ১৫ পয়েন্ট এগিয়ে থেকে লীগ শেষ করে, যদিও মার্চের শুরুতে তারা রিয়ালের বিপক্ষে ২–১ গোলের ব্যবধানে পরাজিত হয়।  তারা কোপা দেল রে এবং চ্যাম্পিয়নস লীগ উভয় প্রতিযোগিতার সেমি-ফাইনালে পৌছায়। সেখানে তারা যথাক্রমে রিয়াল মাদ্রিদ এবং বায়ার্ন মিউনিখের মুখোমুখি হয়। উভয়ের বিপক্ষে পরাজিত হয়ে তারা প্রতিযোগিতা দুইটি থেকে বিদায় নেয়। ১৯ জুলাই, ঘোষণা করা হয় যে টিটো ভিলানোভা গলার ক্যান্সারের কারণে দলের ম্যানেজারের পদ থেকে অব্যাহতি নেবেন এবং পুনরায় চিকিত্‍সা গ্রহন করবেন।

২০১৩ সালের ২২ জুলাই, হেরার্দো ‘টাটা’ মার্টিনো ২০১৩-১৪ মৌসুমের জন্য বার্সেলোনার ম্যানেজার হিসেবে নিশ্চিত করা হয় মার্টিনোর অধীনে বার্সার প্রথম দুইটি খেলা ছিল ২০১৩ স্পেনীয় সুপার কাপের প্রথম ও দ্বিতীয় লেগ, যা বার্সা এওয়ে গোলে জিতে। ২০১৪ সালের ২৩ জানুয়ারী, নেইমারের স্থানান্তর সম্পর্কে অভিযোগ ওঠায় বার্সেলোনার প্রেসিডেন্টের পদ থেকে ইস্তফা দেন সান্দ্রো রোসেল। তার স্থলাভিষিক্ত হন ইয়োসেপ মারিয়া বার্তোমেউ, যিনি ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করবেন। ২০১৪ সালের ২ এপ্রিল, ফিফা ক্লাবটিকে পরবর্তী দুই মৌসুমের ট্র্যান্সফার উইন্ডোতে কোন প্রকার খেলোয়াড় কেনা থেকে নিষিদ্ধ করে। কারণ হিসেবে বলা হয় ক্লাবটি ১৮ বছরের কম বয়সী খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে ফিফার খেলোয়াড় স্থানান্তর সম্পর্কিত আইন ভঙ্গ করেছে।  বার্সেলোনা কর্তৃপক্ষ ফিফার এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে। ২৩ এপ্রিল, ফিফা বার্সেলোনার উপর তাদের আরোপিত নিশেধাজ্ঞা মূলতবি করে।২০ আগাস্ট, ২০১৪ ফিফা বার্সেলোনার করা আপিল খারিজ করে দেয়।

১৭ মে, লা লিগার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য আতলেতিকো মাদ্রিদের (যাদের কাছে পরাজিত হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল বার্সেলোনাকে) বিপক্ষে খেলায় জয় আবশ্যক ছিল বার্সেলোনার। কিন্তু খেলাটি ড্র হয়, যার ফলাফলস্বরূপ চ্যাম্পিয়ন হয় আতলেতিকো মাদ্রিদ।

২০১৪-১৫ মৌসুমে বার্সেলোনা লা লিগা, কোপা দেল রে এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের মাধ্যমে ট্রেবল জয় সম্পন্ন করে এবং প্রথম ইউরোপীয় ক্লাব হিসেবে দুইবার ট্রেবল জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করে। ১৭ মে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদকে হারানোর মাধ্যমে বার্সেলোনা তাদের ২৩তম লিগ শিরোপা জয় করে।এটি ছিল বিগত ১০ বছরে বার্সেলোনার ৭ম লা লিগা জয়।৩০ মে ফাইনালে অ্যাথলেটিক বিলবাও কে হারিয়ে বার্সেলোনা ২০১৪-১৫ কোপা দেল রে জয় করে। ৬ জুন বার্সেলোনা ২০১৪-১৫ উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ইয়ুভেন্তুসকে ৩-১ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয় ট্রেবল জয় সম্পন্ন করে।বার্সেলোনার আক্রমণভাগের ত্রিফলা মেসি, সুয়ারেজ এবং নেইমার, যারা “এমএসএন” নামে পরিচিত ছিল, এই মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১২২ গোল করে যা স্পেনীয় ফুটবলের ইতিহাসে কোন দলের আক্রমণভাগের তিন খেলোয়াড় কর্তৃক সর্বোচ্চ গোল।

১১ অগাস্ট ২০১৫ বার্সেলোনা তাদের নতুন মৌসুম শুরু করে সেভিয়াকে ৫-৪ গোলে হারিয়ে যুগ্ম রেকর্ড পঞ্চম বারের মত উয়েফা সুপার কাপ জয়ের মধ্য দিয়ে। তারা বছর শেষ করে আর্জেন্টাইন ক্লাব রিভার প্লেতকে ৩-০ গোলে হারিয়ে রেকর্ড তৃতীয় বারের মত ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে। সুয়ারেজ, মেসি এবং ইনিয়েস্তা এই টুর্নামেন্টের সেরা তিন খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। এই ক্লাব বিশ্বকাপ ছিল বার্সেলোনার ২০তম আন্তর্জাতিক শিরোপা, যা একটি যুগ্ম রেকর্ড, যেখানে অন্য ক্লাবটি হচ্ছে মিশরের আল আহলি।২০১৫ সালে ১৮০টি গোল করার মধ্য দিয়ে বার্সেলোনা এক পঞ্জিকাবর্ষে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়ে যা ২০১৪ সালে রিয়াল মাদ্রিদের গড়া ১৭৮ গোলের রেকর্ড ভেঙে দেয়।

২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শেষ ৮ বছরে ৬ষ্ঠ কোপা দেল রে ফাইনালে ওঠার মাধ্যমে লুইস এনরিকের বার্সেলোনা সর্বোচ্চ ২৮ ম্যাচ টানা অপরাজিত থাকার রেকর্ড ভেঙে দেয় যা ২০১০-১১ মৌসুমে পেপ গার্দিওলার বার্সেলোনা গড়েছিল। ৩ মার্চ রায়ো ভায়োকানোর বিপক্ষে ৫-১ গোলে জয়ের মাধ্যমে বার্সেলোনা টানা ৩৫ ম্যাচ অপরাজিত থাকার স্পেনীয় রেকর্ড গড়ে যা রিয়াল মাদ্রিদের ১৯৮৮-৮৯ মৌসুমে গড়া ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত থাকার স্পেনীয় রেকর্ড ভেঙে দেয়। ২ এপ্রিল ২০১৬ ক্যাম্প ন্যু তে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ২-১ গোলের হার দিয়ে বার্সেলোনার টানা ৩৯ ম্যাচ অপরাজিত থাকার দৌড় শেষ হয়। ১৪ মে ২০১৬ বার্সেলোনা শেষ ৮ মৌসুমে ৬ষ্ঠ লা লিগা জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করে।

২০১৭ সালের ৮ মার্চ বার্সেলোনা চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কামব্যাকের ইতিহাস রচনা করে। চ্যাম্পিয়নস লিগের ২য় রাউন্ডের ম্যাচের প্রথম লেগে বার্সেলোনা ফরাসি ক্লাব পিএসজির কাছে ৪-০ গোলে হেরে বসে। কিন্তু ২য় লেগে বার্সেলোনা পিএসজিকে ৬-১ গোলে হারিয়ে ৬-৫ গোলের মোট হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে পদার্পণ করে।

২০১৭ সালের ২৯ মে বার্সেলোনা তাদের প্রাক্তন খেলোয়াড় এর্নেস্তো ভালভেরদেকে দুই বছরের চুক্তিতে কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয়।

২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ বার্সেলোনা ২০১৭ সালের স্বাধীনতার দাবিতে কাতালান গণভোট এর বিষয়ে তাদের অবস্থান জানিয়ে বিবৃতি প্রদান করে যাতে বলা হয় “ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা, তাদের নানা গোষ্ঠীর সদস্যদের সম্মানপূর্বক, সংখ্যাগরিষ্ঠ কাতালান জনগোষ্ঠীর ইচ্ছাকে সমর্থন করে যাবে এবং তা করতে থাকবে সভ্য, শান্তিপূর্ণ এবং অনুকরণীয় উপায়ে”।বার্সেলোনা বোর্ড গণভোটের দিন অনুষ্ঠিতব্য লাস পালমাসের বিপক্ষে ম্যাচটি সহিংসতার কারণে স্থগিত করার অনুরোধ জানায় কিন্তু লা লিগা কর্তৃপক্ষ তা খারিজ করে দেয়। ফলস্বরূপ ম্যাচটি দর্শকবিহীন মাঠে অনুষ্ঠিত হয়।খেলা চালানোর প্রতিবাদে বার্সেলোনার দুইজন পরিচালক, ইয়র্দি মোনেস এবং কার্লেস ভিলারুবি পদত্যাগ করেন।

 

তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট ও উইকিপিডিয়া ।