এল ক্যাবোলিনহা – প্রেমিকা ছেড়ে আসা এভারটনের স্বপ্নপূরণের গল্প!

0
1684

হাজারো ব্রাজিলিয়ান কিশোর নিত্যদিন একজোড়া বুট পায়ে জড়ায়, ফুটবল নিয়ে অলিতে-গলিতে প্র‍্যাকটিস করে, ভবিষ্যতে একজন প্রোফেশনাল ফুটবলার হউয়ার বাসনায়। কেউ কেউ তো পরিবারের স্বপ্নগুলোর তোয়াক্কা না করে করেই কিংবা অন্য রাস্তায় নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা বাদ দিয়েই নেমে পড়ে ফুটবল নামক গোলক টা নিয়ে। কিন্তু কয়জনের স্বপ্নই বা পুরণ হয়!? কয়জনই বা পারে সকল বাঁধা ডিঙিয়ে নিজেকে একজন প্রোফেশনাল ফুটবলার হিসেবে গড়তে!?

কেবল ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারই নয়, সাউথ আমেরিকার অধিকাংশ ফুটবলারের গল্পই অভাব-অনটন পেড়িয়ে ত্যাগ-তিতিক্ষায় আর হাজারো বাঁধা জয় করার!!

কিন্তু এভারটনের ক্ষেত্রে গল্পটা একটু আলাদা। এভারটনের প্রথম ক্লাব ছিলো জন্মভূমি ব্রাজিলের উত্তর-পুর্বাঞ্চলের শহর ফোর্তালেজার ক্লাব “ফোর্তালেজা ফুটবল ক্লাব” এ, তখন এভারটনের বয়স ছিলো মাত্র ১৩! ফোর্তালেজা ছিলো ব্রাজিলের ২য় বিভাগের দল। দুই বছর সেখানে কাটানোর পর এভারটন নজরে পড়ে গ্রেমিও স্কাউটদের। গ্রেমিও’র মত ক্লাবে ডাক পাওয়া যেকোন স্বপ্নবাজ তরুণ ফুটবলারের জন্যে আশীর্বাদ স্বরুপ, চরম আনন্দের, সুখের; কিন্তু না, এভারটনের মন ভার! এমন খুশির খবরে যেখানে আত্মহারা হওয়ার কথা সেখানে এভারটন মাঠের এক কোণে কাঁদছিলো, অঝোর নয়নে কাঁদছিলো!

কারণটা কি ছিলো, জানেন?? এভারটনের একটি মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিলো! গ্রেমিও ছিলো ফোর্তালেজা থেকে ৩৮০০ কিলোমিটার দূরে! এভারটনের ধারণা ছিলো, বান্ধবী কে এত দূরে ছেড়ে গেলে সে হয়তো তাকে ভুলে যাবে!

এই ব্যাপারে ফোর্তালেজা অ-১৭ দলের কোচ জর্জ ভেরাস বলেন – “আমি এবং এভারটনের বাবা চিন্তিত ছিলাম ওকে রাজী করানো নিয়ে! কিন্তু এভারটন কিচ্ছুতেই রাজী হচ্ছিলোনা! এভারটন আসলে মেয়েটাকে অনেক পছন্দ করতো! সে তার বান্ধবীর সাথে দেখা করতে পারবেনা, ওর যত্ন নিতে পারবেনা; এসব ভেবে ছোট্ট এভারটন অনেক চিন্তায় ছিলো! এরপর আমি ওকে বললাম; তোমার বান্ধবী তোমার জন্যে চাইলেই অপেক্ষা করতে পারে কিন্তু গ্রেমিও হয়তো করবেনা, তোমার জায়গায় হয়তো অন্য কেউ ঢুকে পড়বে! ওকে অনেক বুঝালাম! আমি মজা করে বললাম, মেয়েটি তোমার জন্যে অপেক্ষা না করতে চায়, তবে একটা সময় তুমি ওর চেয়েও সুন্দর কোন জার্মান বা ইতালিয়ান মেয়ে পাবে! ওকে আরো ভালোভাবে বুঝালাম, শেষমেশ ও রাজী হলো।”

ঠিক ছয় বছর পর, এভারটন যেনো পুরো ব্রাজিলের হৃদয়ের মনিকোঠায়, কোটি ব্রাজিল সমর্থকদের এক যুগ পর কোপা আমেরিকার জয়োৎসবে মাতানোর স্বপ্নসারথিদের একজন!

ঠিক ছয় বছর পর, বলিভিয়া কিংবা পেরুর বিপক্ষে এভারটনের দুর্দান্ত দুই গোলের পরে স্টেডিয়াম জুড়ে হাজারো দর্শকের উল্লাস আর স্লোগান!

É Cebolinha! É Cebolinha! É Cebolinha!

এভারটন কে আদর করে গ্রেমিও সমর্থকেরা ‘ক্যাবোলিনহা’ বলে ডাকে! যার ইংরেজি অর্থ দাঁড়ায় “Little Onion”!

সাম্প্রতিক সময়ে “নতুন কাকা/ নতুন পেলে/ নতুন রবিনহো” ডাকনাম বা পরিচয় পাওয়া যেনো ব্রাজিলে একটা ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এভারটনের ক্ষেত্রে একটু ব্যাতিক্রম; কারণ এভারটনের চেহারা আর চুলের স্টাইল!

ব্রাজিলের বিখ্যাত কমিক সিরিজ “Monica’s Gang” এর একটি জনপ্রিয় চরিত্রের নাম ক্যাবোলিনহো! এভারটন কে দেখতে অনেকটাই এই ক্যাবোলিনহো’র মতো! তাই গ্রেমিওতে আসার পরপরই এই ডাকনাম পায় এভারটন।

এভারটন খুবই সিরিয়াস প্রকৃতির মানুষ! সচারাচর কারো সাথে মজামাস্তিতে মেতে উঠেনা! সবচেয়ে বড় কথা, অনুশীলন কিংবা খেলায় এভারটন খুবই মনোযোগী ; ঠিক যেনো ক্লাসে শিক্ষকের সবচেয়ে অনুগত ছাত্রের মতো! আর খেলায় সে ড্রিব্লিং করতে ভালোবাসে, ভয়ডরহীন ভাবে! পরিশ্রমী, স্বাস্থ্য সচেতন!

পরিশ্রমটা সম্ভবত এভারটন শিখেছিলো সে ছোট বেলাতেই; এভারটনকে সাইকেল নিয়ে ১০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে অনুশীলন করতে হতো!

ফোর্তালেজার শুরুটাও দারুণ ছিলো এভারটনের। খেলোয়াড় বাছাই ক্যাম্পে দিয়েছিলেন ট্রায়াল। খেলতে নেমে ৩০ মিনিটেই হ্যাট্রিক করে নজর কাড়েন উপস্থিতিদের। ফোর্তালেজার হয়ে অ-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেন, ছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা! এরপরেই গ্রেমিও’র নজরে পড়েন এভারটন!

গ্রেমিওতে সিনিয়র অভিষেক ঘটে ২০১৪ তে, এভারটনের ১৮ বছর বয়সে। প্রথমে তাকে বেঞ্চেই কাটাতে হয় বেশ কিছুদিন৷ ধীরে ধীরে সে নিজের উন্নতি করে, বিশেষ করে বর্তমান কোচ রেনাটো গাউচের আন্ডারে। ২০১৭ কোপা লিবার্তোদেস জয়ে রেখেছিলেন অবিস্মরণীয় ভুমিকা!

কাঙ্ক্ষিত ব্রাজিল দলে ডাক আসে ২০১৮ তে, আগস্টে। এভারটন নিজের জাত চেনান চলতি ২০১৯ কোপা আমেরিকায়। নেইমারের অভাবে বাম পাশে যে শুণ্যতা ছিলো সুযোগ পেয়ে তার একটুখানি হলেও মিটিয়েছেন এভারটন। বলিভিয়ার বিপক্ষে সাব হিসেবে নেমে অসাধারণ ১ গোল কিংবা পেরুর বিপক্ষের গোল; এভারটন কেবল কোটি ব্রাজিলিয়ানদের হৃদয়ে জায়গায় করে নেননি, তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখিয়েছেন, ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলোর নজড় কেড়েছেন!

সিটি, ইউনাইটেড কিংবা মিলান অনেকদিন থেকেই নজরে রেখেছিলেন এভারটন কে; হয়তো এই উইন্ডোতেই ইউরোপে দল পেয়েও যাবেন।

অনেক আকাঙ্খার একটা শিরোপা কিংবা ব্রাজিলের জন্যে মাস্ট উইন ফাইনাল ম্যাচে এভারটন ভালো খেলুক পরশু, কোটি ব্রাজিলিয়ান কিংবা কোটি ব্রাজিল সমর্থকদের দীর্ঘদিন পর শিরোপা উল্লাসের স্বাদ এনে দিক, ব্রাজিলের জুজু কাটুক; এভারটনের ভবিষ্যৎ’ও আরো সুন্দর হোক, হলুদ জার্সিতে কিংবা ইউরোপের কোন এক ক্লাবের জার্সিতে গোলোৎসবের পর স্টেডিয়াম জুড়ে চ্যান্ট হোক – É Cebolinha! É Cebolinha! É Cebolinha! ❤

আর হ্যা, ঐ মেয়েটি কিন্তু এভারটনের জন্যে অপেক্ষা করেনাই, তাতে কি জীবন তো চলছেই, আর থামবেনা কখনোই