একজন মাশরাফি, হার না মানা যোদ্ধা!

“জীবনের চেয়ে ক্রিকেট অবশ্যই বড় না। তবে ক্রিকেট, জীবনের সবচেয়ে বড় অংশ”
———————- মাশরাফি বিন মোর্ত্তাজা

বিপিএলের গ্রুপ পর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচে ঢাকা প্লাটুন বনাম খুলনা টাইগার্সের মধ্যকার ম্যাচ চলছে। ১১তম ওভারে মেহেদী হাসানের বলে রাইলি রুশোর শট নেওয়া বল উড়ে যাচ্ছিল কাভারে, সেখানে ঝাপিয়ে পড়লেন মাশরাফি, কিন্তু বল তো ধরতে পারেননি, উল্টো আঙুলে আঘাত পেয়ে ইঞ্জুরিতে পরেন৷ মাঠের ভিতরই রক্ত ঝড়তে থাকে৷ ম্যাচশেষে, সেই বাম হাতেই ১৪ টা সেলাই পড়ে। তবে কি আরেকবার ইঞ্জুরির কবলে পড়ে ম্যাশের ক্যারিয়ার শেষ?

সবাই যখন তাই ভাবছেন, তখন ম্যাশ নামক মহাকাব্য ভাবছিলেন অন্য কথা। এই হাত নিয়েই খেলতে নামবেন, দলের বিপদে নেতৃত্ব দিবেন৷ তারপরেও ছিলো সংশয়, সংকোচ। ক্রিকেট পাড়ায় কানাঘুষা, অথচ সবকিছু উপরে ফেলেই আজ মাঠে নেমেছিলেন ঢাকা প্লাটুনের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মোর্ত্তাজা, অবশ্যই বাম হাতে ১৪ টা সেলাইয়ের ব্যান্ডেজ নিয়েই।

খুব যে বেশী কিছু করেছেন তাও না। দল ম্যাচ হেরেছে, নিজে ইঞ্জুরিকবলিত হাত নিয়ে ৪ ওভার বল করেও কোন উইকেট পাননি। তবে এই যে মাঠে নামার গাটস, তাই বা ক’জন দেখায়? এক হাত অচল নিয়েও ব্যাট হাতে শট খেলার চেষ্টা, পুরো ৪ ওভার বল করা। কিংবা ভয়ংকর হয়ে উঠা ক্রিস গেইলের ক্যাচ এক হাতে লুফে নেওয়া তাই বা কম কি সে? দলের জন্য শেষবিন্দু দিয়ে লড়ে যাবো, এই প্রত্যয়ই মানুষকে নিয়ে অনেক দূরে৷

একটু পিছনে ফিরে যাওয়া যাক,

“You broke your left hand but with right hand you have won millions of hearts. Cricket is just a game. Sometimes it’s not Tamim”

এশিয়া কাপে তামিম ইকবাল এক হাতে ব্যান্ডেজ পেঁচিয়েই মাঠে নেমেছিলেন। সেদিন তামিমের ঐ বীরত্বেই মুশি শক্তি পেয়েছিলেন, পাঁজরের ব্যাথা ভুলে গিয়ে শেষবেলায় আরো একবার আহত বাঘের মতোই গর্জে উঠেছিলেন। যে গর্জনে লড়াইয়ের শক্তি পুঁজি পেয়েছিলো বাংলাদেশ, বিজয়ের মালা গলায় দিয়েই মাঠও ছেড়েছিলো।

তামিম চাইলেই ডেসিংরুমে বসে থাকতে পারতেন, ফ্রাকচ্যার হওয়া হাত নিয়ে তো কেউ জোরও করেনি যে নামতেই হবে। কিন্তু সেদিন সাহস যুগিয়েছিলেন যে তাদের অধিনায়ক, একজন নেতা মাশরাফি। নিজেই আগে থেকে গ্লাভস কেটে রেখেছিলেন। বাঘা বাঘা বোলারদের সামনে যার বুক কখনো কাঁপে নি সেই তামিম এবার সাহস টা দেখালেন ফ্র‍্যাকচার নিয়ে। তামিম বলেছিলেন, “আমি গিয়ে এক বল খেলব, আমি যাব।”

শুধু যে তামিম ইকবালেই মাশরাফির অবদান ব্যাপার টা তেমন না, কখনো লিটনের উদ্দেশ্যে ডেসিংরুম থেকে বুক চাপড়িয়ে ” তুই পারবি “ বলে উঠা৷ কখনো বা সাকিব, মুস্তা, মুশি, রিয়াদদের বড়ভাইর মতো আগলে রাখা৷ ডেসিংরুমে একজন মাশরাফি মানেই যেনো অন্যকিছু, হারার আগে হার মানতে না জানা, লড়াইয়ের জন্য সাহস যুগিয়ে দেওয়া, একজন মাশরাফি মানেই যেনো মহাকাব্য।

এবারের বিপিএলে শুরুতে যখন দল পাচ্ছিলেন না, সেখান থেকেই শেষদিকে দল পেয়ে ঢাকা প্লাটুনের অধিনায়ক বনে গিয়েছিলেন, দলকে শেষ চারেও উঠালেন। ব্যাক্তিগত ভাবে বল হাতে ১৩ ম্যাচে নিয়েছেন ৮ উইকেট। আর ব্যাট হাতে শেষের দিকে নেমে করেছেন ৮৫ রান। যার মধ্যে অনেক ম্যাচেই টি-টোয়েন্টির ঝলক দ্রুত রান তুলে দলের জয়ে অবদান রেখেছেন।

এই তো গতকালই বাংলাদেশ জাতীয় দলের নতুন চুক্তিতে তাকে যেনো না রেখে নতুন কাউকে তার জায়গায় নেয় এজন্য বিসিবিকে ফোন দিয়ে অনুরোধ করেছেন৷ স্রেফ নিয়মিত খেলতে পারবেন না বলে ছেড়ে দিয়েছেন লোভনীয় চুক্তি।

গোটা ক্যারিয়ারে যার এত কাটাছেঁড়া, এত ইঞ্জুরি, মোট ১৪ টার উপরে বড় অপারেশন এরপরেও যিনি হাল ছাড়েননি, তার জন্য নতুন করে কিছু বলারও নাই। কিংবদন্তি কিংবা দেশপ্রেমিক রা ত এমনই, দিনশেষে যাদের কাছে নিজের চেয়ে দেশটাই বড়!

এই তো আর কয়েকদিন, শেষের গান চলছে, ততোদিন না হয় মাশরাফির মতোই বলা যায়, ক্রিকেটটাকে উপভোগ করুক, হুঁট করেই হয়তো বা চলে যাবে সবার আড়ালে!