জুভেন্টাসের সাম্রাজ্য ভেঙ্গে দিলো ইন্টার মিলান

0
21

জুভেন্টাসের নয় বছরের আধিপত্যকে খর্ব করে ১১ বছর পর ইতালিয়ান সিরি-আ লিগের শিরোপার জয়ের কৃতিত্ব দেখিয়েছে ইন্টার মিলান। টেবিলের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আটালান্টা গতকাল সাসুলোর সাথে ১-১ গোলে ড্র করায় এন্টোনিও কন্টের দলের ১৯তম লিগ শিরোপা নিশ্চিত হয়। আগেরদিন নিজেদের ম্যাচে অবশ্য ইন্টার মিলান কাল ক্রোটনকে ২-০ গোলে পরাজিত করে চার ম্যাচ হাতে রেখে লিগ শিরোপা জয়ের কাছাকাছি চলে যায়।

এই জয়ে আটালান্টার থেকে ১৩ পয়েন্ট এগিয়ে টেবিলের শীর্ষস্থান মজবুত করেছিল মিলান। এই কন্টের অধীনেই জুভেন্টাস তাদের নয় বছরের শিরোপার প্রথম তিনটি জয় করেছিল। ২০১২ থেকে ২০১২০ পর্যন্ত টানা নয় বছর রেকর্ড নয়বারের ইতালিয়ান লিগের শিরোপাটি নিজেদের কাছে রেখেছিল তুরিনের জায়ান্টরা। ৫১ বছর বয়সী কন্টে ২০১৯ সালে মিলানের দায়িত্ব নেবার পর দ্বিতীয় বছরে এসে শিরোপার দেখা পেলেন।

শিরোপা জয়ের আনন্দে উচ্ছসিত কন্টে বলেছেন, ‘আমি সত্যিই মুগ্ধ। আমরা একটি সাম্রাজ্য ভাঙ্গতে সাহায্য করেছি। নয় বছর ধরে সিরি-এ লিগে রাজত্ব করা একটি দলের থেকে মাত্র দ্বিতীয় মৌসুমেই শিরোপা ছিনিয়ে নেয়া কখনো কল্পনাই করতে পারিনি। এর অর্থ এই নয় যে আমরা জুভেন্টাসের থেকে ভাল দল। তারা একটি দুর্দান্ত ও বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। আমরা শুধুমাত্র কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা শুরু করেছি, চেষ্টা করছি নিজেদের তাদের পর্যায়ে নিয়ে যেতে।’

ইতালিয়ান শিরোপা জযে নগর প্রতিদ্বন্দ্বী এসি মিলানের ১৮ শিরোপার থেকে একটি শিরোপা এগিয়ে থাকলো এসি মিলান। কিন্তু এই তালিকার শীর্ষে থাকা জুভেন্টাসের ৩৬টি শিরোপার থেকে বেশ খানিকটাই পিছিয়ে রয়েছে। ২০১০ সালে হোসে মরিনহোর অধীনে ঐতিহাসিক চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, সিরি-আ ও কোপা ইতালিয়াসহ ট্রেবল জয়ের পর এই প্রথম লিগ শিরোপা ঘরে তুললো লোম্বার্ডিরা। সর্বশেষ তারা ২০১১ সালে কোপা ইতালিয়া শিরোপা জয় করেছিল। ২০১৮ সালে লুসিয়ানো স্পালেত্তির অধীনে ২০১৮ সালে ইউরোপীয়ান শীর্ষ ক্লাব প্রতিযোগিতায় ফিরে আসার আগ পর্যন্ত ছয় বছর তারা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার সুযোগ পায়নি। মরিনহোর বিদায়ের পর ১৩তম কোচ হিসেবে কন্টে ইন্টারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। গত এক দশকে দুইবার ক্লাবটির মালিকানা পরিবর্তিত হয়েছে। ২০১৩ সালে ইন্দোনেশিয়ান ধনকুবের ব্যবসায়ী এরিক তোহরি সারাস গ্রুপের কাছ থেকে ক্লাবটি কিনে নিয়েছিলেন। এরপর ২০১৬ সালে ক্লাবটির বেশীরভাগ শেয়ার কিনে নেয় চাইনিজ ইলেকট্রনিক্স কোম্পানী সানিং হোল্ডিং গ্রুপ।
এই প্রথমবারের মত কোন বিদেশী মালিকানাধীন ইতালিয়ান ক্লাব লিগ শিরোপা জয় করলো।

২০১১ সালে কন্টে জুভেন্টাসের যোগ দেবার আগের দুই মৌসুমে তুরিনের জায়ান্টরা টেবিলের সপ্তম স্থানে থেকে লিগ শেষ করেছিল। কন্টের অধীনে জুভেন্টাসের চেহারা আমুল পাল্টে যায়। ইন্টারের ঠিক এমন প্রত্যাশার কারনেই তাকে দলভূক্ত করা হয়েছিল। ক্লাব সভাপতি স্টিভেন ঝাংও বিশ্বের অন্যতম সেরা কোচকে নিয়োগ দেবার মাধ্যমে তার ক্লাবকে পুনরায় বিশ্বের একটি সেরা ক্লাবে পরিনত করার লক্ষ্যস্থির করেছিলেন। জুভেন্টাসের সাবেক পরিচালক গুইসেপে মারোত্তা ২০১৮ সালে ইন্টারের প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। তুরিনের কন্টের সাথে তিনি কাজ করেছিলেন। ২০১৯ সালে বার্ষিক ১২ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে কন্টেকে দলে ভেড়ানোর পর ঐ বছর ট্রান্সফার মার্কেটে প্রায় ২২০ মিলিয়ন ইউরো ব্যয় করেছিল ইন্টার।

কন্টে বলেন, ‘এখানে আসার সিদ্ধান্ত আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। এটা আমার জন্য একেবারেই নতুন একটি অভিজ্ঞতা। আমি নিজেকে পরীক্ষার মধ্যে ফেলেছিলাম, বড় চ্যালেঞ্জ নিতে আমি সব সময়ই ভালবাসি। এখানকার সব সমর্থকদের মন জয় করা মোটেই সহজ কাজ নয়। আমি সেটা বুঝতে পেরেছি। কিন্তু একটি বিষয় আমি সব সময়ই মানার চেস্টা করি, যে দলেই থাকিনা কেন সেখানেই শতভাগ যেন দিতে পারি।’

স্পালেত্তির অধীনে টানা দু’বছর চতুর্থ স্থানে থাকার পর আবারো ইন্টারকে প্রতিযোগিতায় ফিরিয়ে এনেছিলেন কন্টে। এবারের মৌসুমে একটি মিশ্র শুরুর পর কন্টে জয়ের ফর্মূলা খুঁজে পান। শনিবার ক্রোটনকে ২-০ গোলে হারানোর মাধ্যমে টানা ১৮ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড গড়েছে ইন্টার। টানা তৃতীয়বারের মত চ্যাম্পিয়ন্স লিগের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেবার পর কোপা ইতালিয়া থেকেও বাদ পড়েছে ইন্টার। যে কারনে লিগে মনোযোগী হতে চেষ্টা করেছিল ইন্টার। জানুয়ারিতে জুভেন্টাসকে ২-০ গোলে হারানোর পর শিরোপা জয়ের স্পৃহা কয়েকগুন বেড়ে যায়। এরপর ফেব্রুয়ারিতে এসি মিলানকে ৩-০ গোলে পরাজিত করে টেবিলের শীর্ষস্থানটি দখল করে। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

বেলজিয়ান ফরোয়ার্ড রোমেলু লুকাকু, আর্জেন্টাইন লটারো মার্টিনেজের হাত ধরে ইন্টার ধীরে ধীরে শিরোপার জয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে থাকে। গত ১৮ এপ্রিল নাপোলির সাথে ১-১ গোলে ড্র করার আগ পর্যন্ত টানা ১১টি ম্যাচে জয় তুলে নেয়।
দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ খেলোয়াড় হিসেবে ৩৬ বছর বয়সী গোলরক্ষক ও অধিনায়ক সামির হানডানোভিচের এটি ক্লাবের হয়ে প্রথম শিরোপা। ২০১২ সালে স্লোভাকিয়ান এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ইন্টারে যোগ দিয়েছিলেন।

ইন্টারের এই শিরোপার মাধ্যমে জুভেন্টানের স্বর্ণালী যুগের অবসান হলো। আন্দ্রে পিরলোর অধীনে এবার আর পেরে উঠলো না জুভরা। কন্টের অধীনে জুভেন্টাসের খেলা সাবেক তারকা পিরলো গত গ্রীষ্মে মরিজিও সারির স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন।

গতকাল ইন্টারের সিরি-আ শিরোপা নিশ্চিত হবার ঘন্টাখানেক পর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জোড়া গোলে উদিনেসকে ২-১ গোলে পরাজিত করেছে তুরিনের জায়ান্টরা। এই জয়েও অবশ্য টানা দশম শিরোপা জয় নিশ্চিত করতে পারেনি জুভেন্টাস। দ্বিতীয় স্থানে থাকা আটালান্টার সাথে সমান ৬৯ পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে জুভেন্টাস তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। এখন তাদের লক্ষ্য অন্তত চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপাটা ধরে রাখা। সমান পয়েন্ট নিয়ে চতুর্থ স্থানে রয়েছে এসি মিলান। কালিয়ারির সাথে ১-১ গোলে ড্র করে পয়েন্ট হারানো নাপোলি দুই পয়েন্ট পিছিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে। জেনোয়ার সাথে উত্তেজনাকর ম্যাচে ৪-৩ গোলে জয়ী হয়ে ল্যাজিও শীর্ষ চারের স্থান থেকে পাঁচ পয়েন্ট পিছিয়ে ষষ্ঠ স্থানে থাকলেও তাদের হাতে অতিরিক্ত এক ম্যাচ রয়েছে।

জুভেন্টাস কোচ আন্দ্রে পিরলো বলেছেন, ‘নয় বছরের আধিপত্য শেষ হযেছে, আমরা এখন আর বর্তমান চ্যাম্পিয়ন নই। কিন্তু আবারো আমরা সব লক্ষ্য নিয়েই নতুন মৌসুমে নতুন ভাবে শুরু করতে চাই। দীর্ঘ নয় বছর যে কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠা নিয়ে আমরা শিরোপা জয় করেছি তা একবারেই শেষ হয়ে যাবেনা। আমরা এবার এমন কিছু দলের সাথে পয়েন্ট হারিয়েছি যাদের পরাজিত করা উচিত ছিল। এখন শুধুমাত্র চ্যাম্পিয়ন্স লিগে পৌঁছানোই মূল লক্ষ্য।’