আলফনসো ডেভিসের শরণার্থী শিবির থেকে ইউরোপ জয়ের গল্প

0
26

বুডুবুরাম, ঘানার এক শরণার্থী শিবির। এখানেই পৃথিবীর আলো দেখেন আলফনসো ডেভিস। লাইবেরিয়ায় চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে ডেভিসের বাবা-মা পালিয়ে চলে এসেছিলেন এখানেই। নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল তাদের জীবন। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে দিনাতিপাত করতে থাকা সেই পরিবারটির জীবনে ছিল ভালো কিছুর অপেক্ষা।

ডেভিসের বাবার মতে, “সেখানকার জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত কঠিন, কারণ বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় ছিল বন্দুক বহন করা, যেটাতে আমাদের মোটেও আগ্রহ ছিল না। এজন্য এই স্থান ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেই আমরা। সেখানে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় আমাদের, কানাডায় যাওয়ার জন্য একটি ফর্ম পূরণ করতে হয় এবং সাক্ষাৎকারসহ আরো কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করি আমরা, এরপরই কানাডায় চলে আসি।”

ডেভিসের বয়স তখন মোটে পাঁচ। কানাডায় যাওয়ার পর পরিবারের প্রায় সবাই এমনকি ডেভিসকেও কাজ করতে হয়েছে ছোট দুই ভাইবোনকে বড় করে তোলার জন্য, তাদের দেখাশোনা করা, তাদের জন্য দুধ গরম করাসহ বিভিন্ন কাজ ডেভিস শিখে গিয়েছিলেন অল্প বয়সেই। এর পাশাপাশি মাদার তেরেসা ক্যাথলিক স্কুলে যেতেন ডেভিস, আর সেখানেই ডেভিসের ফুটবলীয় প্রতিভা প্রথমবারের প্রকাশ পেতে শুরু করে।

সেখানকার শিশুদের জন্য আয়োজিত কিছু স্থানীয় টুর্নামেন্টে অংশ নেন ডেভিস। অসাধারণ পারফরম্যান্সে নজর কাড়েন স্থানীয় কোচদের, সেই সূত্র ধরেই যোগ দেন সেন্ট নিকোলাস সকার একাডেমিতে। শুরুর দিকে ডেভিস খেলতেন আনন্দের জন্যই, শখের বশে। কিন্তু ডেভিস ছিলেন আর দশজনের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতাসম্পন্ন এবং এর ফলে সেই শখটাকেই ধীরে ধীরে বানিয়ে ফেলেছেন পেশা। দারুণ প্রতিভাবান ডেভিসের খবর ছড়িয়ে পড়তে লাগল দেশ-বিদেশে। কানাডার এক ক্লাব ভ্যাঙ্কুভার হোয়াইটক্যাপ্স ১৪ বছর বয়সী ডেভিসকে নিজেদের আবাসিক একাডেমীর আওতায় তাকে ভ্যাঙ্কুভারে নিয়ে যেতে চায়, কিন্তু ডেভিসের মা-বাবা অল্প বয়সী ডেভিসকে দূরে পাঠাতে রাজি ছিলেন না। শেষমেশ বাবা-মা কে রাজি করেই ভ্যাঙ্কুভার যাওয়ার অনুমতি পান ডেভিস।

ভ্যাঙ্কুভারের জার্সিতে দারুণ পারফরম্যান্সের সুবাদে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই প্রথম পেশাদার চুক্তি পেয়ে যান ডেভিস। এরপর ক্লাবের হয়ে মাঠে নেমে এমএলএসের ইতিহাসে সবচেয়ে কমবয়সী খেলোয়াড় হিসেবে অভিষেক হয় ডেভিসের। নিজের প্রতিভার জানান দিতে থাকা ডেভিসের খবর জানাজানি হয়ে যায় ইউরোপেও। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে বায়ার্নে নাম লেখান ডেভিস। এমএলএসের ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বিবেচনা করা হয় ডেভিসকে, সেখানকার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়েই তাকে দলে টানে বায়ার্ন।

বায়ার্নে শুরুর পথটা মসৃণ ছিল না। প্রথম আধা মৌসুমে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন মাত্র ৭৪ মিনিট। এমএলএসে নিয়মিত খেলে আসা ডেভিসের জন্য সময়টা ছিল বেশ কঠিন। ২০১৯-২০ মৌসুমের শুরুর দিকে সুলে আর লুকাস হার্নান্দেজের ইঞ্জুরির কারণে কপাল খুলে যায় ডেভিসের। আলাবাকে সেন্টারব্যাকে এনে লেফটব্যাক হিসেবে ডেভিসকে খেলার সুযোগ করে দেন নিকো কোভাচ। কোভাচ চলে যাওয়ার পর ফ্লিকও নিয়মিত সুযোগ দিয়েছেন ডেভিসকে। নিজের গতি আর দক্ষতার কারণে দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছেন বায়ার্নের খেলার ধরণের সাথে। চেলসি-বার্সার বিপক্ষে দারুণ পারফরম্যান্সে নিজেকে চিনিয়েছেন নতুনভাবে। বায়ার্নের ইউসিএল জয়ে শেষ হয়েছে মৌসুম, যেখানে মৌসুমজুড়েই দারুণ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ডেভিস।

জীবনের শুরু শরণার্থী শিবিরে। সেখান থেকে কানাডা ঘুরে বুন্দেসলিগায় এসে এবার ইউরোপ জয়। তরুন ডেভিস নিজের পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেন কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়। ডেভিসের আগামীর জন্য রইল শুভকামনা।