আমার চোখে রিকার্ডো কাকা

0
50

মাত্র ১৭ বছর বয়সেই ডাক্তারদের পরামর্শ ছিল ফুটবলটা ছেড়ে দিতে হবে। আর সেই ছেলেটি ৩৫ বছর অতিক্রম করার পর অতঃপর বুট জোড়া উপরে তুলে বিদায় জানায়। ভাবা যায়?

কৈশোরে প্রথম যাকে ভালো লাগে তার প্রতি জন্মানো সেই অনুভুতিটা সারাজীবনই থাকে। রিকার্ডো কাকা যেনো ঠিক সেই মানুষটাই । কোন এক সময় যখন বাচ্চা ছেলেরা এসে জিজ্ঞেস করবে কি গো দাদু, এখনো “রিকর্ডো কাকা?” কি পেলে তাকে ভালোবেসে? আমি মৃদু হেসে বলবো, লাভ- ক্ষতি ভেবে কি আর ভালোবাসা যায় রে? প্রথম জীবনের ভালোবাসাটা ভুলি কি করে তোরাই বল!

পৃথিবীতে যে গুটিকয়েক ফুটবলারের আক্ষরিক অর্থেই কোনো নিন্দুক নেই, তাদের মধ্যে কাকা একজন। ক্যারিয়ারে অর্জনের পাশাপাশি রাইভালদের ভালোবাসাও পেয়েছিলেন অগনিত।

আমাকে একবার একজন জিজ্ঞেস করেছিল “লাভ এট ফাষ্ট সাইটে” বিশ্বাস করেন? উত্তরে তাকে বলে দিয়েছিলাম করি না ভাই। এই সব চোখের মুগ্ধতা। এক দেখায় কি প্রেম হয় নাকি! এক পলকে কখনোই কি ভালবাসা জন্মে না! এ সবই ফেইরি টেলের গল্প। রূপকথার রুপানঞ্জেলের কল্পকাহিনীতে এসব এক দেখায় প্রেমের গল্প মানায়। বাস্তবে এসব সম্ভব না হতেও পারে না!

তো এরপর একদিন খেলা দেখতে বসলাম! ব্রাজিলের খেলা! হঠাৎ ডি বক্সের বাহির থেকে ডেভার সুকেনের ক্রোয়েটদের সাথে কার্ভ করা শটে গোলের পর দুহাত উপরে তুলে সেলিব্রেশন “লাভ এট ফার্স্ট সাইট” বলে কিছু আছে তার প্রমান ঐদিনই তিনি আমাকে জানিয়ে দিলেন। নেশায় একবার পেয়ে বসলে তার থেকে বেড়িয়ে আসা অনেক কঠিন! রক্তের সাথে আনাগোনার বড় সম্পর্ক! দুনিয়ার এত নেশা থাকতে ফুটবল আমার ধ্যান জ্ঞানে যিনি রুপ দিয়েছেন আজই তার জন্মদিন!!

এরপর থেকে নিজের মত পাল্টিয়েছি। এখন যদি কেউ এসে জিজ্ঞেস করে লাভ এট ফার্ষ্ট সাইটে বিশ্বাস করেন? আমি মুচকি হেসে বলবো, হ্যা ভাই আগে করতাম না তবে কাকাকে দেখার পর এখন অবশ্যই বিশ্বাস করি।

আমার বন্ধুরা যখন সিগারেট খেত তখন প্রায়ই ওদের বলতাম এইটা খেয়ে কি বা হয় তোদের ভাই? আর ওরা উত্তরে বলতো এইটা একটা নেশা রে ভাই একবার ধরলে বুঝবি আর ছাড়তে পারবি! আমিও ওদের উত্তর শুনে হাসতাম ধরলে আবার ছাড়া যাবে নাহ মানে কি আছে এমন! কিন্তু ওদের কথা এখন ঠিকই উপলব্ধি করতে পারি, আসলেই নেশা এক জিনিস। কাকার কারনেই ফুটবল আর মাদ্রিদের নেশায় পড়ে বসা সেই নেশা থেকে এখনো মাদ্রিদের একটা খেলাও মিস দেই না যতই খারাপ সিচুয়েশনে পরি নাহ কেন! অথবা মন খারাপের রাতে বা কোনো এক অলস দুপুরে বা বৃষ্টিস্নাত বিকেলে ইউটিউবে আগ্রহবশত বা আবেগতাড়িত হয়ে হয়ত খুঁজে ফিরতে থাকি কাকার সেরা মুহূর্তের ভিডিওগুলো। কাকা হাসবেন। কাঁদবেন।

আজ থেকে ৪০ বছর পরে যখন ছেলেপেলেরা লাল জার্সিতে রাস্তায় দৌড়াবে, আমি লাঠি ভর দিয়ে কোনোরকমে হেটে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দেখতে থাকবো। অতঃপর চোখে চশমাটা দিয়ে কাঁপাকাঁপা হাতে রিমোট চেপে টিভি অন করতেই শুনবো ”রিকার্ডো কাকা” । দেখবো গ্যালারীর কোন এক কোনে মানুষটা বসে আছে। চোখ দিয়ে হয়তো কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পরবে, চশমা সরিয়ে চোখ মুছতে মুছতেই ভাববো।
আমি নস্টালজিক হবো, স্মৃতির পাতায় নিজেকে খুঁজে হারাবো, ফেলে আসা কোন এক উপন্যাসে ডুব দেবো। নস্টালজিয়ায় ভরা সেই উপন্যাসের প্রতিটা পাতায় স্বর্ণাক্ষারে এক নায়কের নাম লেখা থাকবে সেটা আপনার! পড়তে পড়তে আবেগে রুদ্ধ হবো,চশমার কাঁচে বাস্প জমবে, সেই বাস্প মুছে আবার জীবনে ফিরে যাবো।

মনে পড়বে কতবার যে কাকা কাকা চিৎকারে সবার ঘুম ভাঙিয়েছি! বাচ্চা ছেলেরা এসে জিজ্ঞেস করবে কি গো দাদু, এখনো “রিকর্ডো কাকা “!!! কি পেলেন আর? আমি মৃদু হেসে বলবো,
লাভ- ক্ষতি ভেবে কি আর ভালোবাসা যায় রে।প্রথম জীবনের ভালোবাসাটা ভুলি কি করে।

জীবনের শেষ দিনগুলোতে কাপাকাপা হাতে ইউটিউবের সার্চ বক্সে লিখব” Ricardo Kaka one the গ্রেয়াতেস্ত” দেখতে থাকবো দুহাত উচিয়ে ছুটতে থাকা সেই সেলিব্রেশনগুলো। দেখবো ২০০৬ ইউ.সি.এলের এর সেকেন্ড রাউন্ড কোয়ার্টারের গোলসহ সেমিফাইনাল প্রথম লেগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে ওল্ড ট্রাফোর্ডের ম্যাচে তার পারফরম্যান্সটা, ৮৮ মিনিটে তাকে উঠিয়ে নেওয়ার সময় দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাচ্ছিল ইউনাইটেড সমর্থকেরাও সেই দৃশ্যটা।

স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের মতে, ঐ ম্যাচে কাকার পারফরম্যান্স তার দেখা অন্যতম সেরা একক নৈপুণ্য। ৩-২ ব্যবধানে হারলেও জোড়া গোল করেছিলেন কাকা। ওই ম্যাচে করা তার দ্বিতীয় গোলটা, ইউটিউবে খুঁজে ফেরবেন এই জেনারেশনের সবাই । সিডর্ফের পাস থেকে ডানপায়ের টোকায় গ্যাবব্রিয়েল হেইঞ্জের মাথার ওপর দিয়ে বল নিলেন। বামপাশ থেকে প্যাট্রিস এভরাকে এগিয়ে আসতে দেখে হেড করলেন বলে। হেইঞ্জ-এভরার মুখোমুখি সংঘর্ষ। ডিবক্সে ভ্যান ডার সারকে একা পেয়ে ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়ালেন কাকা। পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে তখন রাজ্যের নীরবতা। অবিশ্বাস্য! অতিমানবীয়!

জানি এই মেসেজটি কোনোদিন আপনার কাছে পৌছবে না। হয়তো বা শত শত ইন্ডিভিজুয়াল ট্রফি জিতেনি কিন্তু হৃদয় জিতেছো যা শত-সহস্র ট্রফি দিয়ে কেনা যায়না। ভালোবাসবো আমরন! কোনো এক অলস দুপুরে বা বৃষ্টিস্নাত বিকেলে ইউটিউবে আগ্রহবশত বা আবেগতাড়িত হয়ে হয়ত খুঁজে ফিরতে হবে কাকার সেরা মুহূর্তের ভিডিওগুলো। কাকা হাসবেন। কাঁদবেন।

আর দুই হাত তুলে ধন্যবাদ জানাবেন তার ইশ্বরকে তার সঙ্গী থাকবো আমিও! আহ জীবন ! তুমি বড়ই সুন্দর! শেষটা হোক জন কিটস এর অমৃত বাণী দিয়েইঃ “Beauty is trurth, truth is beauty ”
কিন্তু রিকার্ডো কাকা এর খেলা দেখে মনে হলঃ
“Beauty is Football, Football is beauty ”

সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ রিকর্ডো ইজেকসন দোস সান্তোস লেইতে – কাকা।