আঁকড়ে ধরে টেস্ট বাঁচালো ভারত

0
9

ষষ্ঠ উইকেটে অবিশ্বাস্যভাবে জুটি বেঁধে ২৫৮ বল মোকাবেলা করে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিডনি টেস্টে ভারতকে জয়ের সমান দুর্দান্ত এক ড্র’র স্বাদ দিলেন দুই ব্যাটসম্যান হনুমা বিহারি ও রবীচন্দ্রন অশ্বিন।

অস্ট্রেলিয়ার ছুঁড়ে দেয়া ৪০৭ রানের বিশাল টার্গেটে খেলতে নেমে চতুর্থ দিন শেষে ২ উইকেটে ৯৮ রান করেছিলো ভারত। ফলে সিডনি টেস্ট জিততে আজ ম্যাচের পঞ্চম ও শেষ দিন ৮ উইকেট হাতে নিয়ে ভারতকে আরও ৩০৯ রান করতে হতো। আর অস্ট্রেলিয়ার জিততে প্রয়োজন ছিলো প্রতিপক্ষের ৮ উইকেট।

শেষ পর্যন্ত ১৩১ ওভার ব্যাট করে ৫ উইকেটে ৩৩৪ রান করে ম্যাচ ড্র করে ভারত। অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের সামনে ধৈর্য্যর পরীক্ষা দিয়ে সফলতা পেয়েছেন ভারতের ব্যাটসম্যানরা। সিরিজের তৃতীয় টেস্টে ড্র হওয়ায় চার ম্যাচের সিরিজে এখন ১-১ সমতা বিরাজ করছে।

পঞ্চম ও শেষ দিনে ব্যাট হাতে নামেন আগের দিনের দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যান চেতেশ্বর পূজারা ও অধিনায়ক আজিঙ্কা রাহানে। পূজারা ৯ ও রাহানে ৪ রান নিয়ে শুরু করেন।

ইনিংসের ৩৬ ও দিনের ১০ম বলেই ভারত শিবিরে আঘাত হানেন অস্ট্রেলিয়ার স্পিনার নাথান লিঁও। লিঁওর অফ-স্টাম্পের ডেলিভারিতে শর্ট লেগে ম্যাথু ওয়েডকে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন ভারত অধিনায়ক রাহানে। ১৮ বলে ৪ রানেই থেমে যান তিনি।

রাহানের বিদায়ে উইকেটে পূজারার সঙ্গী হন উইকেটরক্ষক ঋসভ পান্থ। ব্যাটিংএ প্রমোশন পেয়ে পাঁচ নম্বরে নামেন তিনি। উইকেটে সেট হতে, সর্তকতার সাথে খেলতে থাকেন পান্থ। অন্যপ্রান্তে সর্তক ছিলেন পূজারাও। উইকেট বাঁিচয়ে খেলাই মূল লক্ষ্য ছিলো পূজারা-পান্থের। তাই ৪৭ওভার পর্যন্ত ভারতের রানের গতি ছিলো একেবারেই ধীর গতির। রাহানের আউটের পর ৬৮ বলে মাত্র ১৪ রান যোগ করেন পূজারা-পান্থ।

উইকেটে সেট হবার পরই মারমুখী মেজাজ নেন পান্থ। অসি স্পিনার লিঁওর উপর চড়াও হন পান্থ। ৩টি চার ও ১টি ছক্কা মারেন তিনি। আর ৫৭তম ওভারের প্রথম দু’বলে দু’টি ছক্কা মারেন পান্থ। পরের বলে ১ রান নিয়ে ৬৪ বলে টেস্ট ক্যারিয়ারের তৃতীয় হাফ-সেঞ্চুরির স্বাদ নেন পান্থ। হাফ-সেঞ্চুরির পর দ্রুত রান তুলতে পারেননি পান্থ।আবারো সাবধনতা অবলম্বন করেন তিনি। দেখেশুনে খেলছিলেন পান্থ। অন্যপ্রান্তে পূজারা ছিলো আরও ধীর গতির। এতে অবিচ্ছিন্ন থেকে মধ্যাহ্ন-বিরতিতে যান পূজারা-পান্থ। পূজারা ১৪৭ বলে ৪১ ও পান্থ ৯৭ বলে ৭৩ রানে অপরাজিত ছিলেন। ৭০ ওভার শেষে ভারতের রান ছিলো ৩ উইকেটে ২০৬।

বিরতির পর টেস্ট ক্রিকেটে ৬’হাজার রান পূর্ণ করেন পূজারা। ছয় হাজার ক্লাবে প্রবেশ করে ইনিংসের ৭৬তম ওভারে লিঁওকে বাউন্ডারি মেরে ১৬৯ বলে ৮০ ম্যাচের টেস্ট ক্যারিয়ারে ২৭তম হাফ-সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন পূজারা। প্রথম ইনিংসে হাফ-সেঞ্চুরি করে থেমেছিলেন তিনি।

পূজারার হাফ-সেঞ্চুরির পর ক্যামেরুন গ্রিন ও লিঁওকে দু’টি করে, সর্বমোট ৪টি বাউন্ডারি মেরে নব্বইয়ের ঘরে পৌছে যান পান্থ। টেস্ট ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরির স্বপ্ন দেখছিলেন দু’বার জীবন পাওয়া পান্থ।

কিন্তু ৮০তম ওভারের প্রথম বলে পান্থের স্বপ্নকে চুরমার করে দেন লিঁও। লিঁওর বলে কামিন্সকে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ক্যাচ দিয়ে নার্ভাস নাইন্টিতে আউট হন পান্থ। ১২টি চার ও ৩টি ছক্কায় ১১৮ বলে ৯৭ রান করেন পান্থ। চতুর্থ উইকেটে ২৬১ বলে ১৪৮ রানের জুটি গড়েন পূজারা-পান্থ। চতুর্থ ইনিংসে ভারতের পক্ষে চতুর্থ উইকেটে সর্বোচ্চ রানের জুটি এটি।

পান্থকে হারানোর পর হনুমা বিহারিকে নিয়ে উইকেটে টিকে থাকার লড়াই শুরু করেন পূজারা। ৮৩তম ওভারে কামিন্সকে পরপর তিনটি চার মেরে ভারতের রানের গতি বাড়িয়েছিলেন তিনি। তবে পূজারা-বিহারির ব্যাটিংএ, ম্যাচ ড্র’র পরিকল্পনা করেছিলো ভারত। কিন্তু পান্থের ওয়ানডে স্টাইলের ব্যাটিং ভারতকে জয়ের স্বপ্নও দেখা শুরু করে
৮৯তম ওভারে পূজারাকে আউট করে অস্ট্রেলিয়ার দিকে ম্যাচের লাগাম টেনে আনেন হ্যাজেলউড। উইকেটে সেট হয়ে যাওয়ায় পূজারার ধৈর্য্যশীলকে ইনিংসের ইতি টানেন হ্যাজেলউড। ২০৫ বলে ১২টি চারে ৭৭ রান করেন পূজারা।

পূজারার আউটের পর ম্যাচ নিয়ে চিন্তায় পড়ে যায় ভারত। কারন বিহারির অফ-ফর্ম, রবীন্দ্র জাদেজার ইনজুরি ভাবিয়ে তুলে ভারতকে। জাদেজার ইনজুরিতে এক ধাপ উপরে উঠে ক্রিজে বিহারির সঙ্গী হন রবীচন্দ্রন অশ্বিন। তবে দলের প্রয়োজনে ব্যাট-প্যাড পড়ে প্রস্তুতও হয়ে যান জাদেজা। ব্যাথা নাশক ইঞ্জেকশন নিয়ে খেলতে প্রস্তুত ছিলেন তিনি।
ষষ্ঠ উইকেটে বিহারি ও অশ্বিন দারুন ব্যাট করে চা-বিরতির আগ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন। বিহারি ৫২ বলে ৪ ও অশ্বিন ২৫ বলে ৭ রানে অপরাজিত ছিলেন। শেষ সেশনে ১২৭ রান প্রয়োজন পড়ে ভারতের। অস্ট্রেলিয়ার দরকার পড়ে ৫ উইকেট। তখনও ম্যাচের প্রায় ৩৫ ওভার বাকী ছিলো।

এই ৩৫ ওভার উইকেটে মাথা থিতু গেড়ে ব্যাট করতে থাকেন বিহারি ও অশ্বিন। রানের পেছনে না ছুটে উইকেট বাঁচিয়ে খেলায় মনোযোগি হন তারা। সময় গড়ানোর সাথে-সাথে শেষ হচ্ছিলো একের পর এক ওভার। অস্ট্রেলিয়ার কপালে চিন্তার ভাজও পড়ছিলো। ম্যাচ বাঁচানোর স্বপ্ন নিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে ব্যাট করছিলেন বিহারি ও অশ্বিন।

১০১তম ওভারে জীবনও পেয়ে যান অশ্বিন। এরপর অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের চারটি বাউন্ডারিতে দলের স্কোর ৩শতে নিয়ে যান অশ্বিন। আর অন্যপ্রান্তে বল খেলার দিক দিয়ে সেঞ্চুরি করেন বিহারি। যখন বল খেলার দিক দিয়ে সেঞ্চুরি পান বিহারি, তখন তার রান ৬।

নিজের ইনিংসে ১২৫তম বলে প্রথম বাউন্ডারি মারেন বিহারি। পরবর্তীতে ম্যাচ ড্র’র নিয়ন্ত্রন হাতে নাগালে নিয়ে আরও ৩টি চার মেরেছেন এই চাপের মুখে দারুন ব্যাট করা বিহারি। অফ-ফর্মের সাথে দলকে হারের হাত থেকে বাঁচানোর বোঝা মাথায় নিয়ে খেলা শুরু করেছিলেন বিহারি। শেষ পর্যন্ত অশ্বিনকে নিয়ে ম্যাচ ড্র করেন বিহারি।

বিহারি ও অশ্বিনের উইকেট ভাঙ্গতে অকেশনাল বোলার গ্রিন-লাবুশেনসহ দলের মূল বোলারদের বার-বার ঘুড়িয়ে ফিরিয়েও আক্রমনে আনেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক টিম পাইন। শেষপ র্যন্ত বিহারি ও অশ্বিনের ব্যাটি-এর সামনে পাইনের দলের সকল পরিকল্পনাই ভেস্তে যায়। বিহারি ও অশ্বিনের ব্যাটিংএর দারুন এক ড্র’র স্বাদ নেয় বিরাট কোহলিবিহীন ভারত।

১৬১ বলে ৪টি চারে বিহারি ২৩ ও ১২৮ বলে ৭টি চারে অশ্বিন ৩৯ রানে অপরাজিত থাকেন। অস্ট্রেলিয়ার হ্যাজেলউড-লিঁও ২টি করে ও কামিন্স ১টি উইকেট নেন। প্রথম ইনিংসে ১৩১ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৮১ রান করে ম্যাচ সেরা হন স্মিথ।

চতুর্থ ইনিংসে সবচেয়ে বেশি ওভার খেলে ভারতের পক্ষে ম্যাচ ড্র’তে এই ম্যাচটি পঞ্চমস্থানে জায়গা করে নিলো। ১৯৭৯ সালে ওভালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চতুর্থ ইনিংসে ১৫০ দশমিক ৫ ওভার ব্যাট করে ড্র করেছিলো ভারত। সেটিই তাদের এখন পর্যন্ত সেরা সাফল্য।

এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এশিয়ার দল হিসেবে চতুর্থ ইনিংসে সবচেয়ে বেশি ওভার খেলে ম্যাচ ড্র’র নয়া রেকর্ড গড়লো ভারত। অবশ্য আগের রেকর্ডটিও ভারতের ছিলো। ২০১৪/১৫ মৌসুমে সিডনিতে ৮৯ দশমিক ৫ ওভার খেলে ম্যাচ ড্র করেছিলো ভারত।

আগামী ১৫ জানুয়ারি থেকে ব্রিসবেনে শুরু হবে সিরিজের চতুর্থ ও শেষ টেস্ট।

সংক্ষিপ্ত স্কোর (টস-অস্ট্রেলিয়া) :
অস্ট্রেলিয়া : ৩৩৮ ও ৩১২/৬ ডি, ৮৭ ওভার (গ্রিন ৮৪, স্মিথ ৮১, সাইনি ২/৫৪)।
ভারত : ২৪৪ ও ৩৩৪/৫, ১৩১ ওভার (পান্থ ৯৭, পূজারা ৭৭, হ্যাজেলউড ২/৩৯)।
ফল : ড্র।
ম্যাচ সেরা : স্টিভেন স্মিথ (অস্ট্রেলিয়া)।
সিরিজ : চার ম্যাচের সিরিজে ১-১ সমতা।